
ইবি রিপোর্ট
দেশের বাজারে চলতি বছর লুব্রিকেন্টের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে কিছু লুব্রিকেন্ট পণ্যের দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি ও মোটরসাইকেল মালিকদের ব্যয় আরও বেড়েছে। তবে লুব্রিকেন্টের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, সরবরাহ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত ব্যয়ই লুব্রিকেন্টের দাম বাড়ার প্রধান কারণ।
লুব্রিকেন্টস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও আরএম অটোমোবাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে লুব্রিকেন্ট এবং স্থানীয় ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টে ব্যবহৃত বেস অয়েল আমদানি করে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে লুব্রিকেন্ট আমদানির ব্যয় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। এরপর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে এবং কিছু লুব্রিকেন্ট পণ্যের দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, লুব্রিকেন্টের দাম বাড়ার সঙ্গে সরকারের নেওয়া জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের বাজারও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশের লুব্রিকেন্ট বাজারে আরও মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
এমজেএল বাংলাদেশের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহীন আলম জানান, লুব্রিকেন্টের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ বেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতি। একটি লুব্রিকেন্টের মিশ্রণে প্রায় ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বেস অয়েল থাকে। বাকি অংশে থাকে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডিটিভস।
তিনি জানান, কাতারের পার্ল জিটিএলসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদনকারীদের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে উন্নত মানের বেস অয়েলের সরবরাহ কমেছে।
সংকট শুরুর আগে যে বেস অয়েলের দাম টনপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯০০ ডলার ছিল, তা এখন বেড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে জানান শাহীন আলম। একই সময়ে সিনথেটিক বেস অয়েলের দাম টনপ্রতি ৩ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে শোধনাগারগুলো কিছু কাঁচামাল ডিজেল উৎপাদনের দিকে সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হওয়ায় বিশেষ করে গ্রুপ-২ ও গ্রুপ-৩ বেস অয়েলের সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু গ্রেডের সিনথেটিক বেস অয়েল সংগ্রহ করতে ক্রেতাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। একই সঙ্গে সরবরাহের নিরাপত্তা ও পণ্যের দাম—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপের প্রভাব দেশের খুচরা বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রহমত মোটরসের স্বত্বাধিকারী মো. রহমতুল্লাহ জানান, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় লুব্রিকেন্ট পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মোবিল স্পেশাল-এর চার লিটারের প্যাকের দাম ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। মোবিল ৫ডব্লিউ-৩০-এর চার লিটারের দাম ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। আর মোবিল ওয়ানের চার লিটারের প্যাকের দাম ৬ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে।
ট্রান্সমিশন ফ্লুইডের দামও বেড়েছে। কিছু পণ্যের চার লিটারের প্যাকের দাম কয়েকশ টাকা বেড়ে ২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। জাপানি সিভিটি এফই তেলের দাম ৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার টাকা হয়েছে।
রহমতুল্লাহ আশঙ্কা করছেন, খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে কেনা নতুন স্টক বাজারে তোলার পর লুব্রিকেন্টের দাম আরও এক দফা বাড়তে পারে।
মোটরসাইকেলের লুব্রিকেন্ট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফেয়ার অটোর মোহাম্মদ রাসেল জানান, গত কয়েক মাসে কিছু ইঞ্জিন অয়েলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। এতে ক্রেতারাও আগের তুলনায় কেনাকাটার ক্ষেত্রে বেশি হিসাব-নিকাশ করছেন।
নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইফতেখার শিমুল জানান, জানুয়ারিতে তিনি যে ইঞ্জিন অয়েল ৮৫০ টাকায় কিনতেন, এখন একই পণ্যের দাম বেড়ে ১ হাজার ১৫০ টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশে লুব্রিকেন্টের বাজারের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টন লুব্রিকেন্টের চাহিদা রয়েছে।
দেশের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি স্থানীয় ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বাকি অংশ আসে আমদানি করা সম্পূর্ণ প্রস্তুত লুব্রিকেন্ট থেকে। মোট ব্যবহৃত লুব্রিকেন্টের প্রায় ৪৭ শতাংশ অটোমোটিভ খাতে ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টগুলো গ্রুপ-১, গ্রুপ-২ ও গ্রুপ-৩ বেস অয়েলের জন্য পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এসব বেস অয়েলের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের শোধনাগার থেকে আসে। পাশাপাশি বিশেষায়িত অ্যাডিটিভসও আমদানি করতে হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার—সবকিছুর চাপই দেশের উৎপাদক ও আমদানিকারকদের ওপর পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নৌরুটে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, নৌপথে ঝুঁকি বাড়ার কারণে লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ফ্রেইট, বিমা ও ট্রানজিট খরচও বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানিকারকরা বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংকট ও ঋণপত্র বা এলসি নিয়েও চাপের মধ্যে রয়েছেন। এর পাশাপাশি আমদানি করা লুব্রিকেন্টের কাস্টমস মূল্যায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তাও ব্যয় বাড়াচ্ছে।
শাহীন আলম জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে বিমার প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং জাহাজের সীমিত প্রাপ্যতার কারণে এশিয়ার বাজারে বেস অয়েল ও প্রস্তুত লুব্রিকেন্ট পরিবহনের খরচও বেড়েছে।
সম্প্রতি সরকার ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। এতে যানবাহনের মালিক ও ফ্লিট অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় আরও বেড়েছে।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানির দাম সমন্বয় সরাসরি লুব্রিকেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে না। তবে এর ফলে ভোক্তাদের একদিকে জ্বালানি, অন্যদিকে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, লুব্রিকেন্টের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে দামের প্রতি সংবেদনশীল ক্রেতাদের একটি অংশ নিম্নমানের, পুনর্ব্যবহৃত বা নকল পণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে বাজারে প্রকৃত ও ব্র্যান্ডেড লুব্রিকেন্টের পাশাপাশি নিম্নমানের পণ্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে দেশের লুব্রিকেন্ট বাজার বর্তমানে দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের সরবরাহে আন্তর্জাতিক সংকট ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।