• হোম > আন্তর্জাতিক | বিদেশ > এআই ব্যবহারে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে, সতর্ক করলেন বিল গেটস

এআই ব্যবহারে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে, সতর্ক করলেন বিল গেটস

  • সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৯
  • ৯

---

 

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর মতে, জরুরি মুহূর্তে এআই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য কথিত ‘কিল সুইচ’ রাখাই যথেষ্ট নয়। বরং এআইয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, এর আচরণের রেকর্ড রাখা এবং প্রযুক্তির মধ্যেই নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস এ সতর্কতা জানান।

গেটস বলেন, শুধু একটি ‘কিল সুইচ’ থাকলেই এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করা যাবে না। তবে তিনি কিল সুইচের বিরোধিতা করছেন না বলেও স্পষ্ট করেন। তাঁর মতে, এআইয়ের খারাপ বা বিপজ্জনক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রযুক্তিটি কী করছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারি এবং তার রেকর্ড থাকা প্রয়োজন।

এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারের প্রসঙ্গে গেটস বিশেষভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর আশঙ্কা, এআই এমন সব কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে, যার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

গেটস বলেন, এআই এমন ঘটনা ঘটানোর মতো শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাঁর মতে, মানবজাতির সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হলেও অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের হাতে অত্যাধুনিক এআই চলে গেলে এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো অস্ত্র আগে কখনো ছিল না।

বিল গেটস মনে করেন, শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে এআই বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখলে হবে না। বরং গবেষণাগার পর্যায় থেকেই এআই মডেলগুলোর আচরণ সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, এআই গবেষণাগারগুলোতে মডেলগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিতে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির মধ্যেই নিরাপত্তাব্যবস্থা সংযুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

গেটসের মতে, এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শীতল যুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি করার চেয়েও কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন।

এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের চেয়ে বর্তমানে অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের হাতে এআইয়ের ব্যবহারকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে দেখছেন গেটস।

তাঁর মতে, এআই ব্যবহার করে সাইবার হামলা চালানো, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এলোমেলো করে দেওয়া কিংবা বিদ্যুৎ গ্রিড বন্ধ করে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

গেটস বলেন, এআইয়ের সাহায্যে এখন ছোট ছোট গোষ্ঠী এমন কিছু করতে পারে, যা আগে কেবল বড় দেশগুলোর পক্ষেই করা সম্ভব ছিল। তাই মূল ঝুঁকি হচ্ছে অসৎ উদ্দেশ্যের সঙ্গে এআইয়ের সংমিশ্রণ।

তিনি মনে করেন, সরকারগুলো বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে পারে।

এআইয়ের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও নাকচ করেছেন গেটস। এ বিষয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

ট্রাম্পের অবস্থান হলো, এআই খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হলে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গেটস বলেন, ট্রাম্প যা বলেছেন তা ঠিক আছে। তবে তিনি মনে করেন, তাঁর এবং অন্যদের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

ট্রাম্প চলতি মাসের শুরুতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই নিয়ে লিখেছিলেন, যে দেশ এআইয়ে জয়ী হবে, তারাই জয়ী হবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনসহ অন্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে আছে এবং এগিয়ে থাকবে।

বিল গেটস মনে করেন, এআই নিরাপত্তার মানদণ্ড তৈরিতে বিশ্বব্যাপী ঐকমত্য প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবেশনীতি এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অতীতের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে গেটস বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রেও মানবজাতির সম্মিলিত নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তাঁর মতে, এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন দেশ একই নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করবে।

বিল গেটসের সতর্কতার সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন মহলের উদ্বেগেরও মিল রয়েছে। অ্যানথ্রপিকের তথ্যফাঁসকারী কর্মকর্তা জ্যাকব কক্সন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, এআই তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করেন, চলতি দশক শেষ হওয়ার আগেই প্রযুক্তিটি মানবজাতির জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানসহ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরাও এআই উন্নয়নের গতি ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

আমোদেই এক ব্লগ পোস্টে শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি চীনের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মার্কিন আইনপ্রণেতা রো খান্না এনবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে দুই দেশের মধ্যে এআইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়নে একটি যৌথ কারিগরি কর্মীগোষ্ঠী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

তিনি মনে করেন, এমন এআই মডেল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যেগুলো নিজেদের সক্ষমতা নিজেরাই বারবার উন্নত করতে পারে।

খান্নার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারে, যা বাস্তবায়নযোগ্য ও যাচাইযোগ্য হবে এবং যেখানে এ ধরনের এআই ব্যবস্থার ওপর নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে।

ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, দুই দেশ এআইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে কার্যকর সংলাপ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও আলোচনা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিল গেটস দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর অতীত যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

বিচার বিভাগের প্রকাশ করা নথিতে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পর গেটসকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

জবাবে গেটস বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি জানিয়েছিলেন যে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করতে পারবেন। তবে গেটসের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

গেটস আরও বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর সময় কাটানো—অন্য অনেক মানুষের মতো—কোনো না কোনোভাবে এপস্টিনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করেছিল। বিষয়টি তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে বিল গেটসের বক্তব্যে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি এর নিরাপত্তা, নজরদারি ও অপব্যবহার ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। তাঁর মতে, শুধু প্রযুক্তিকে প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়, বরং এআই কীভাবে কাজ করছে তা বোঝা, পর্যবেক্ষণ করা এবং শুরু থেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18309 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 08:39:44 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh