
ইবি রিপোর্ট
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড) গত দুই দশকে বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে মাত্র ১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পাঞ্চলে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৭ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ দুই দশকে কেইপিজেডে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪১২ গুণ।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার পারভেজ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) এসব তথ্য জানিয়েছেন।
বেপজা সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে কার্যক্রম শুরু করা কেইপিজেড থেকে ২০০৭ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো পণ্য রপ্তানি শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার প্রথম অর্থবছর ২০০৭-০৮ সালে এখান থেকে ৯ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়তে থাকে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত কেইপিজেড থেকে মোট ১৪ হাজার ১৫৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বর্তমানে এ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট ২৫৮টি শিল্প প্লট রয়েছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন ২ হাজার বর্গমিটার। এসব প্লটে বর্তমানে বড়, মাঝারি ও ছোট শ্রেণির মোট ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এর মধ্যে ২৯টি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন। তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগের এবং আটটি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন।
এ ছাড়া ৪৯ হাজার ৭৯৮ বর্গমিটার ফ্লোর স্পেসজুড়ে আরও পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়নকাজ চলছে। নতুন এসব প্রতিষ্ঠান চালু হলে কেইপিজেডে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
কেইপিজেডে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়াসহ মোট ১৪টি দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন।
বেপজা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরেও কেইপিজেডের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে এখান থেকে ১ হাজার ৪৪৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৫ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১ হাজার ১৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ছিল ১ হাজার ২৫৯ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ১ হাজার ২৩০ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
কেইপিজেডের কারখানাগুলোতে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র, ব্যাগ, ফ্যাশন পোশাক ও সেফটি স্যুট।
এসব পণ্যের অনেকগুলোই বিশ্বের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের জন্য উৎপাদন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি ইইউর বাইরের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রেও কেইপিজেডে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
কেইপিজেডের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পণ্যের বহুমুখীকরণ কেইপিজেডের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বিপুল রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এসেছে বিশ্বমানের পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে। বর্তমানে কেইপিজেড উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বখ্যাত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ক্রীড়া পোশাক, ক্যাম্পিং তাঁবু, উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন সামগ্রী এখানে উৎপাদিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী পতেঙ্গা এলাকায় পরিত্যক্ত চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জমিতে বেপজা কেইপিজেড গড়ে তোলে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই বৃহৎ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানের মুখে পড়ে। পরে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের স্বর্ণযুগে সেখানে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। একসময় হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা এই শিল্পাঞ্চলটি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকটাই প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
তবে পরবর্তীতে সেখানে কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পতেঙ্গা শিল্পাঞ্চলে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে। বিশেষায়িত এই শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ে কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কেইপিজেডের উদ্বোধন করেন।
এর মধ্য দিয়ে পতেঙ্গা শিল্পাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। গত দুই দশকে বিনিয়োগ ও রপ্তানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সেই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেছে।
বর্তমানে বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগ, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্ণফুলী ইপিজেড বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।