
ইবি রিপোর্ট
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত তুলতে গিয়ে মুনাফা, সুদ বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছাড়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে আমানতকারীদের। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো মামলা, অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না—এমন শর্তও রাখা হয়েছে অঙ্গীকারনামায়। এ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। আর্থিক অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক পাঁচটি হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের হাতে।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কোনো গ্রাহক বা আমানতকারী ব্যাংক থেকে মূল টাকা একসঙ্গে তুলে নিতে চাইলে তাকে অঙ্গীকারনামায় সই করতে হচ্ছে। এতে মূল টাকার বাইরে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি না করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে মামলা, অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার শর্ত রয়েছে।
দুই পৃষ্ঠার ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’ অনুযায়ী, এককালীন মূলধন নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আমানত হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, মূল টাকা তুলে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আমানতকারী ভবিষ্যতে আমানত নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, অভিযোগ, মামলা, আবেদন বা আপিল করতে পারবেন না। এমনকি কোনো আইনি পদক্ষেপও নেওয়া যাবে না।
এই শর্ত শুধু বর্তমান আমানতকারীর ক্ষেত্রেই নয়; তার উত্তরাধিকারী, নমিনি ও আইনগত প্রতিনিধির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর নিজের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক ব্যাংকটি থেকে মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা আমানত তুলে নেওয়ার আবেদন করেছেন।
এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক ইতোমধ্যে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ সময়ে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৪টি। এসব নতুন হিসাবে জমা হয়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। তখন দুই বছরের মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল।
তবে গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানতের ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট থাকছে না। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের আমানতের মূল অর্থ তুলতে পারবেন বলেও জানানো হয়।
এরপরও পুরো মূল টাকা একবারে তুলতে গিয়ে গ্রাহকদের মুনাফা ও ভবিষ্যৎ আইনি দাবি ছাড়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে। এ কারণে অনেকে আবেদন করার পরও টাকা তুলতে ব্যাংকে আসছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এই ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তাদের মুনাফাসহ আসল টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। সেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে যারা টাকা চাইছেন, তাদের মুনাফা কেটে রাখা হচ্ছে। সাময়িক সংকট কেটে গেলে অন্যরা মুনাফাসহ টাকা তুলতে পারবেন।
অঙ্গীকারনামায় সব ধরনের দাবি ছেড়ে স্বাক্ষর করার বিষয়ে তিনজন আমানতকারীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আমানতকারী মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘যে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে, তা অবৈধ এবং আমানতকারীদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ। আমরা এর প্রতিকার ও ন্যায্যতা চাই।’
আবদুর রহমান নামে আরেক আমানতকারী ২১ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডির উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি জরুরি আবেদন নিষ্পত্তিতে শাখা পর্যায়ে দেরির অভিযোগ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ৬ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় আবেদন করেছিলেন। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর ব্যবস্থাপক তাকে ২০ বা ২১ সেপ্টেম্বর যোগাযোগ করতে বলেন। কর্মসূত্রে বগুড়ায় অবস্থান করায় ২০ সেপ্টেম্বর তিনি আবার যোগাযোগ করলে পরদিন ব্যাংকে যেতে বলা হয়। ছুটি নিয়ে ব্যাংকে যাওয়ার পর তাকে জানানো হয়, তার আবেদন এখনো অনুমোদন হয়নি।
আরেক আমানতকারী আকিকুল বাশার চৌধুরী অভিযোগ করেন, হেয়ারকাট বাতিলের প্রজ্ঞাপন ১০ সেপ্টেম্বর হলেও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ময়মনসিংহ সদর শাখা ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা পায়নি। মেয়াদ শেষ হওয়া এফডিআর ও ডিপিএস ভেঙে জরুরি প্রয়োজনে আংশিক টাকা তোলার আবেদন করেও ২০ দিনেও প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদন পাননি বলে জানান তিনি।
এদিকে গত সোমবার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপককে ব্যক্তিগত মেয়াদি আমানত এবং স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ ও স্থিতি পুনর্হিসাবের বিষয়ে চিঠি দিয়েছে।
তবে মুনাফার হার কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।
একই চিঠিতে মৃত আমানতকারীর হিসাবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে উত্তরাধিকারী বা বৈধ দাবিদারের কাছে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ব্লক থাকা হিসাবের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে হিসাব আনব্লক করে টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।