
ইবি রিপোর্ট
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশগত প্রভাব বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচিত বিষয়। কোনো পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত পরিবেশের ওপর মোট প্রভাব পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন পদচিহ্ন। বাংলাদেশে ডেইরি খামারে উৎপাদিত দুধের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় আগের বিভিন্ন হিসাবের তুলনায় নতুন ও তুলনামূলকভাবে কম নির্গমনের তথ্য উঠে এসেছে।
ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাটের অ্যানিমেল সায়েন্স এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক জার্নাল অব ডেইরি সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি ফার্ম থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ডেইরি খামারে দুধ উৎপাদনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট হিসাব করেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডেইরি ফার্মের মোট কার্বন নির্গমনের প্রায় ৪৮ শতাংশ আসে গরুর পরিপাক প্রক্রিয়া থেকে। এরপর খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সার থেকে প্রায় ২৪ শতাংশ, গোবর ব্যবস্থাপনা থেকে ২০ শতাংশ এবং খামার পরিচালনায় ব্যবহৃত শক্তি থেকে ৮ শতাংশ কার্বন নির্গমন হয়।
গবেষণায় মানসম্মত লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে শুধু দুধ উৎপাদনকারী গরু নয়, খামারের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য গবাদিপশুকেও কার্বন ফুটপ্রিন্টের হিসাবের আওতায় রাখা হয়েছে।
গবেষক ইলিয়াস উদ্দিনের মতে, খামারের উৎপাদনব্যবস্থার অংশ হওয়ায় দুধ না দেওয়া প্রাণীদের হিসাব থেকেও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এসব প্রাণীর জন্যও খামারের খাদ্য, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহৃত হয়, যা সামগ্রিকভাবে পরিবেশগত প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত।
সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ডেইরি খামারগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় দুধ উৎপাদনে কার্বন ফুটপ্রিন্ট বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়। এর অন্যতম কারণ উৎপাদনশীলতার পার্থক্য। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে একটি গরু প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি গরুর দৈনিক দুধ উৎপাদন সাধারণত ৪ থেকে ৮ লিটারের মধ্যে থাকে।
তবে নতুন গবেষণায় বাংলাদেশের ডেইরি খামারের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়ে আগের অনুমানের তুলনায় ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত কার্বন পদচিহ্ন আগের অনুমানের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ কম।
গবেষণার পাঁচ বছরের সময়কালে উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা ও সুষম খাদ্য ব্যবহারের ফলে গরুর উৎপাদনশীলতা ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে খামারের কার্বন নির্গমনও কমেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে খামারের কার্বন নির্গমন প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে।
গবেষক ইলিয়াস উদ্দিন বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে শুধু কার্বন নির্গমন কমানোর কৌশল গ্রহণ করলেই হবে না। বরং উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কম সম্পদ ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রতি ইউনিট উৎপাদনে পরিবেশগত চাপ কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের ডেইরি খাতের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশে মাংস ও দুধ উৎপাদনের জন্য আলাদা খামার ব্যবস্থার প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে একই গবাদিপশু থেকে দুধ ও মাংস—দুই ধরনের উৎপাদন সুবিধা নেওয়া হয়।
ফলে বাংলাদেশের খামারগুলোয় মোট কার্বন নির্গমনের মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ দুধ উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ করা হয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ একই খামারের গবাদিপশু থেকে একাধিক ধরনের উৎপাদন সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের ডেইরি ব্যবস্থার কার্বন হিসাবেও ভিন্নতা রয়েছে।
গবেষকেরা মানুষের পুষ্টির জন্য উৎপাদিত ক্যালোরির ভিত্তিতে এককপ্রতি কার্বন নির্গমন হিসাব করার সুযোগও তৈরি করেছেন। এতে বিভিন্ন দেশের উৎপাদনব্যবস্থার পরিবেশগত দক্ষতা আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলনা করা সম্ভব হবে।
বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব এখন ক্রেতা ও আমদানিকারকদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে বাংলাদেশের কৃষি ও ডেইরি খাতের প্রকৃত কার্বন ফুটপ্রিন্ট সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য থাকা কৃষকদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের মতে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত খামার পরিচালনা পদ্ধতি অনুসরণ করলে বাংলাদেশে দুধ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কার্বন নির্গমনও কমানো সম্ভব। ফলে পরিবেশগত টেকসইতার সঙ্গে দেশের ডেইরি খাতের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।