• হোম > অর্থনীতি | সারাদেশ > ডিজেলের দাম বাড়তেই ট্রাকভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত

ডিজেলের দাম বাড়তেই ট্রাকভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:২৩
  • ১১

---

 

ইবি রিপোর্ট

ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর দেশের পণ্য পরিবহন খাতে ট্রাকভাড়া বেড়ে গেছে। দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে এক ট্রিপের ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো রুটে এই বাড়তি খরচ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

পরিবহন ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ এখন পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীর কাঁচাবাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাবের পর বাজারে দ্বিতীয় দফায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। নতুন দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয়েছে দর-কষাকষি।

বেনাপোল থেকে ১৫ টন পণ্য ঢাকায় পরিবহনে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা হয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া থাকলেও এখন তা বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ রুটে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা থেকে ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ দূরত্ব ও গন্তব্যভেদে একেকটি ট্রিপে বাড়তি ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কিছু রুটে এই বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বেনাপোল প্রতিনিধি কাজী শাহজাহান সবুজ জানান, ভাড়া বাড়ানো নিয়ে আমদানিকারক ও ট্রাকচালকদের মধ্যে দর-কষাকষির পাশাপাশি বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করায় পরিবহন ব্যয়ের এই পরিবর্তন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ট্রাক পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানির পেছনে যায়। এর সঙ্গে টায়ার, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, টোল ও ফেরির খরচও রয়েছে। আবার পণ্য নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পর অনেক ট্রাককে খালি ফিরতে হয়। ফলে জ্বালানির বাড়তি দাম এবং খালি ফেরার পরিচালন ব্যয়—দুই দিক থেকেই পরিবহন খরচে চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর খান বলেন, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় না হওয়ায় মালিকরা চাপের মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণে কিলোমিটার ও পণ্যের ওজনের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সঙ্গে ওই কাঠামো অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

ট্রাকভাড়া বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও দেখা যাচ্ছে। কাওরান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য আনতে ট্রাক ও পিকআপের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচ খেত থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকার এবং পাইকার থেকে খুচরা পর্যায়ে ভাগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।

শুধু অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন নয়, আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি বেসরকারি আইসিডি ও অফডক পণ্য পরিবহন ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কয়েকটি চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে।

ফলে বন্দর থেকে পণ্য বের হওয়ার আগেই ট্রাকভাড়ার পাশাপাশি বাড়তি হ্যান্ডলিং ও অন্যান্য লজিস্টিক ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ জানিয়েছেন, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়া অনিবার্য। এর প্রভাব উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।

তিনি জানান, রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং আমদানি কনটেইনারের ২০ থেকে ২৩ শতাংশ বেসরকারি অফডকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ট্রাকভাড়ার বাড়তি চাপের সঙ্গে এখন লজিস্টিক ব্যয়েরও নতুন চাপ যুক্ত হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানির দাম বাড়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ট্রিপপ্রতি ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। এবার ডিজেলের দাম নতুন করে ২০ টাকা বাড়ায় একই রুটসহ দেশের অন্যান্য পণ্য পরিবহন পথেও ভাড়া সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিবহন মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, গণপরিবহনের মতো পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো করা হোক। কিলোমিটার, পণ্যের ওজন এবং গাড়ির ধরন বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হলে জ্বালানির দাম বাড়ার পর প্রতিবার নতুন করে দর-কষাকষির প্রবণতা কমবে বলে মনে করছেন তারা।

ডিজেলের বাড়তি দাম তাই শুধু ট্রাক পরিচালনার হিসাবই বদলাচ্ছে না, পণ্য বাজারে পৌঁছানোর খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বন্দর থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হলে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18173 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 03:18:08 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh