
ইবি রিপোর্ট
গ্যাসসমৃদ্ধ ভোলায় নতুন শিল্পপার্ক গড়ে তুলছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দ্বীপজেলার ভোলা সদর উপজেলার চর ভেদুরিয়ায় প্রায় ১ হাজার বিঘা জমির ওপর নির্মাণাধীন এই শিল্পপার্কে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। আগামী মাস থেকে সেখানে কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরই মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কার্যালয় এবং নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য শেড নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের একটি বড় অংশ তুলনামূলক বেশি গ্যাস ও জ্বালানি প্রয়োজন এমন শিল্পে করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসভিত্তিক সিরামিক ও কাচপণ্য উৎপাদন। ভোলায় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রাপ্যতা এবং পণ্য পরিবহনে নৌপথের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এসব শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগের বড় অংশ প্রাণ-আরএফএলের নিজস্ব অর্থ ও ব্যাংকঋণ থেকে আসবে। পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও প্রকল্পে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে গ্রুপটির।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, ভোলার শিল্পপার্কে উৎপাদন ভবনগুলোর নকশা ও পরিকল্পনার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে চারটি উৎপাদন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রতিটি ভবনের আয়তন হবে ৬০ হাজার বর্গফুট। চারটি ভবনের মোট আয়তন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪০ হাজার বর্গফুট। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে এসব ভবনে উৎপাদন শুরু হবে।
জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে সংযোগকারী সঞ্চালন পাইপলাইন না থাকায় ভোলায় থাকা গ্যাসের একটি অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক বেশি গ্যাস প্রয়োজন এমন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে প্রাণ-আরএফএল।
প্রস্তাবিত পণ্যের মধ্যে থাকবে গ্যাসভিত্তিক সিরামিক ও কাচপণ্য। এগুলো প্রাণ-আরএফএলের নতুন পণ্যশ্রেণি হিসেবে যুক্ত হবে।
এ ছাড়া বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গ্রুপটির অন্যান্য শিল্পপার্কে উৎপাদিত পণ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও ভোলায় কারখানা স্থাপন করা হবে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাইপ, ভাসমান সামগ্রী, ছাঁচে তৈরি বিভিন্ন পণ্য, চেয়ার, পানির ট্যাংক, টেবিল, দরজা, খেলনা ও জুতা।
প্রাণ-আরএফএল ২০২৮ সালের মধ্যে শিল্পপার্কটিকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পুরোপুরি চালু হলে সেখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন গ্রুপটির কর্মকর্তারা।
বর্তমানে শিল্পপার্কে অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ, জমি উন্নয়ন, শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের আবাসন এবং ৬০ হাজার বর্গফুটের একটি গুদাম নির্মাণের কাজ চলছে।
প্রস্তাবিত কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে প্রাণ-আরএফএল। পাশাপাশি শিল্পপার্কে গ্যাস সরবরাহের জন্য নতুন ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের আবেদনও করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে। তাদের মতে, ভোলায় শিল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দামে গ্যাস সরবরাহ করা হলে এ অঞ্চলে আরও উদ্যোক্তা বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারেন।
বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। একই সময়ে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতা শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে যেখানে তুলনামূলক সহজে গ্যাস পাওয়া যায়, কিন্তু বড় আকারে শিল্পায়ন এখনো সীমিত—এমন এলাকাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে প্রাণ-আরএফএল।
গ্রুপটির কর্মকর্তারা এ কৌশলের উদাহরণ হিসেবে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে অবস্থিত শিল্পপার্কের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
তাদের মতে, ভোলার শিল্পপার্কও একই ধরনের বড় বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি নতুন শিল্পভিত্তি গড়ে উঠতে পারে।
সরকার ভোলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের যে পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবায়িত হলে শিল্পপার্কটিতে যাতায়াত আরও সহজ হবে। পাশাপাশি মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার বাড়ানো গেলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে।
ভোলায় উৎপাদিত পণ্য যেখানে সম্ভব, সেখানে নৌপথে পরিবহনের পরিকল্পনা করেছে প্রাণ-আরএফএল। এতে সড়কের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ভোলার তুলনামূলক কাছেই রয়েছে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর। তবে পর্যাপ্ত পণ্য পরিবহন না থাকায় বন্দর দুটি এখনো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না।
শিল্প খাতের কর্মকর্তাদের মতে, ভোলায় প্রাণ-আরএফএলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় কারখানা স্থাপিত হলে এই দুই বন্দরের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়তে পারে।
তারা মনে করেন, ভোলায় প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকারের নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
প্রাণ-আরএফএল জানিয়েছে, শিল্পপার্কের নির্মাণ ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের ফলে চলতি বছরই অন্তত ২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে নির্মাণশ্রমিকসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মী থাকবেন।
শিল্পপার্কে নিয়োগ পাওয়া শ্রমিকদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রাণ-আরএফএলের অন্যান্য শিল্পপার্ক ও কারখানায় চালু থাকা প্রশিক্ষণব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও এখানে কাজে লাগানো হবে।
শিল্পপার্কটি পুরোপুরি চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় মানুষের চলে যাওয়ার প্রয়োজনও কমতে পারে।
শিল্পপার্কে উৎপাদিত পণ্য প্রথম দিকে দেশের বাজারে সরবরাহ করা হবে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর সুযোগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে প্রাণ-আরএফএলের।