
ইবি রিপোর্ট
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পরপরই বেসরকারি খাতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে সেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যয় সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো জ্বালানিনির্ভর ছয় ধরনের সেবার মাশুলে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজের ভাড়াও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত অপারেটররাও চলমান চুক্তির দর জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একের পর এক সেবার মাশুলে যুক্ত হলে আমদানি পণ্যের পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। অন্যদিকে রফতানি পণ্যের বাড়তি পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সোমবার এক সার্কুলারে জ্বালানিনির্ভর ছয় ধরনের সেবার মাশুলে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করায় আইসিডিগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে সর্বশেষ পর্যালোচিত মাশুলের ওপর নতুন সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
বর্ধিত মাশুলের আওতায় রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন বা হাওলেজ চার্জ। একই সঙ্গে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন এবং ওঠানো-নামানোর চার্জেও সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রফতানি পণ্য কনটেইনারে ভরা ও হ্যান্ডলিংয়ের প্যাকেজ চার্জ এবং রফতানি কনটেইনারের ভেরিফায়েড গ্রস মাস (ভিজিএম) চার্জেও একই হারে সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোয় রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনার পর কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হয়। আমদানি পণ্যের একটি অংশও বন্দর থেকে ডিপোতে এনে খালাস করা হয়। এসব কার্যক্রমে প্রায় এক হাজার কনটেইনার পরিবহনকারী ট্রেইলার এবং ২৫০টি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়।
এ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে ৭০ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বলেন, ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এতে আইসিডিগুলোর পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি আইসিডিগুলোর যেসব সেবা ডিজেলনির্ভর, সেসব সেবার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ সারচার্জ কার্যকর করা হয়েছে। এ ফুয়েল সারচার্জ শতাংশের হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কাউকে নির্দিষ্ট কোনো রেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিপোর সেবা গ্রহণকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিপোর যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তিতে নির্ধারিত দরের ওপর সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর নিচে কেউ সেবা দিতে বা নিতে সক্ষম হলে তা করতে পারবে।
ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, অংশীজনদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা ছাড়া এভাবে মাশুল বাড়ানো হলে তা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবে না।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়া মাশুল নির্ধারণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এর ফলে রফতানিকারকদের ওপরই চাপ বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মো. তানভীর মনে করেন, দেশের শিল্প খাত কঠিন সময় পার করছে, যা সরকারও উপলব্ধি করছে।
তিনি বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আইসিডি বা অন্যান্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সঙ্গে সঙ্গে চার্জ বাড়িয়ে দিচ্ছে, রফতানিকারকেরা বায়ারদের কাছ থেকে সেভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে নিতে পারছেন না।
রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিটি সেন্টের জন্য দরকষাকষি করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ইউনিটপ্রতি দামও কমেছে। অন্যদিকে অপারেশনাল কস্টের কারণে খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে তারা ক্রমাগত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছেন।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনেও পড়ছে।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বড় জাহাজ থেকে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন পণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। বছরে বহির্নোঙর থেকে অভ্যন্তরীণ নদীপথে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়।
এ কাজে এক হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে।
ডিজেলের দাম বাড়ার পর চট্টগ্রাম-ঢাকা নৌপথে লাইটার জাহাজের ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, একটি জাহাজের চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় জাহাজ ভাড়া বাড়বে—এটাই বাস্তবতা। সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনও চলমান চুক্তির দর সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বানের সময় ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮০ টাকা। সর্বশেষ ২০ টাকা বৃদ্ধির পর তা দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ।
ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য একাধিকবার বাড়লেও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দর সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে দর সমন্বয়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনে এখন বাড়তি খরচ হবে।
তবে তিনি বলেন, বাস্তবতাও বুঝতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ভর্তুকি বেশিদিন চালিয়ে যাওয়াটাও সহজ নয়। সেক্ষেত্রে আবার ভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকায় বাড়ানোর পর চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের বিভিন্ন স্তরে ব্যয় সমন্বয়ের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কনটেইনার ডিপোর সেবামাশুলে সারচার্জ, লাইটার জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি এবং বন্দরকেন্দ্রিক অপারেটরদের চুক্তির দর সমন্বয়ের দাবির ফলে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এসব বাড়তি ব্যয় একদিকে আমদানি পণ্যের পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা খরচ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে রফতানি খাতের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।