• হোম > অর্থনীতি | বিদেশ | বিশ্ব সংবাদ | বিশ্ববাণিজ্য > পানামা খাল পার হতে মাশুল উঠেছে ৫০ লাখ ডলারে

পানামা খাল পার হতে মাশুল উঠেছে ৫০ লাখ ডলারে

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৪
  • ১৩

---

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহন চাপ বেড়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। একই সময়ে পশ্চিম গোলার্ধের চরম আবহাওয়াও নৌপরিবহনে প্রভাব ফেলছে। এতে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা পানামা খালেও বাড়ছে জাহাজ চলাচলের চাপ।

সম্প্রতি কয়েকটি বড় পণ্যবাহী জাহাজকে পানামা খাল পার হতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়েছে। পানামা খালের প্রশাসক ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এই মাশুল রেকর্ড পর্যায়ের।

প্রায় ৫০ মাইল দীর্ঘ পানামা খাল দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৬ শতাংশ পণ্য পরিবহন করা হয়। বিভিন্ন কারণে জাহাজগুলো বিকল্প নৌপথে যেতে বাধ্য হওয়ায় এই খালের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

চলতি বছরের গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত নিলামে কোনো কোনো জাহাজের পারাপার মাশুল ১০ লাখ ডলারের বেশি উঠেছিল। অথচ ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা জানান, বাজারের চাহিদার ওপর মূলত মাশুল নির্ধারিত হয়। ভবিষ্যতে কোনো কোনো জাহাজের জন্য ২০ লাখ বা ৩০ লাখ ডলারের দরও উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

পানামা খাল দিয়ে চলাচলকারী অধিকাংশ জাহাজ কয়েক মাস আগেই তাদের পারাপারের সময় নির্ধারণ করে। মোট জাহাজ চলাচলের প্রায় ৯০ শতাংশের সূচি এভাবে আগাম সংরক্ষণ করা হয়। জাহাজে থাকা পণ্যের ধরন ও পরিমাণের ওপর সাধারণত আগাম সূচি সংরক্ষণের খরচ নির্ভর করে।

তবে কিছু সূচি নিলামের জন্য রাখা হয়। জরুরি প্রয়োজন হলে কাছাকাছি সময়ে এসব সূচির মাধ্যমে জাহাজ পার করা যায়। বর্তমানে এসব সূচির নিলাম শুরু হয় ১ লাখ ডলার থেকে। চলতি মৌসুমে নিলামে গড় দর ছিল প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। নির্দিষ্ট দিনে দ্রুত খাল পার হতে চাওয়া কিছু জাহাজ বেশি দর দেওয়ায় সম্প্রতি মাশুল ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলারে উঠেছে।

এলএনজি পরিবহনে বাড়ছে ব্যবহার

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বহনকারী ট্যাংকার পানামা খাল ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের শস্য, চিলির ওয়াইন এবং চীনের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যও এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। পানামা খালের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের পথেও পরিবর্তন এসেছে। এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় বন্দর থেকে এশিয়ার বাজারে গ্যাস পাঠানোর চাপও বেড়েছে।

নরওয়ের অসলোভিত্তিক সামুদ্রিক পরিবহন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, বিশেষ করে এশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি প্রতিদিন বাড়ছে।

এলএনজি বহনকারী জাহাজগুলো সাধারণত আগে থেকে পানামা খালের সূচি সংরক্ষণ করে না। ফলে জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে নিলামে অংশ নিয়ে বেশি দামে সূচি কিনতে হয়।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ইউরোপে এলএনজির চাহিদা বেড়েছিল। তখন এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো পানামা খাল ব্যবহার কমিয়ে ইউরোপের দিকে যেতে শুরু করে। বর্তমানে এসব জাহাজ আবার এই খালে ফিরছে।

ইলিয়া এসপিনো দে মারোত্তা বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে এশিয়ার বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে। এর সঙ্গে পানামা খাল দিয়ে এলএনজি পরিবহনও বাড়ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে তিন থেকে চার মাস পানামা খালে জাহাজ চলাচল বেড়েছিল। তখন প্রতিদিন ৩৮ থেকে ৪১টি জাহাজ খাল পার হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ৩৪ থেকে ৩৬টি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।

তবে চরম আবহাওয়ার কারণে সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন জাহাজ পারাপারের সংখ্যা কমিয়ে ৩২টিতে নামিয়েছে। এল-নিনোর কারণে সৃষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতি জ্বালানির বাজার ও উপকূলীয় অবকাঠামোয় প্রভাব ফেলছে। এতে পানামা খাল পারাপারের খরচও বাড়ছে।

খরায় কমছে পানির স্তর

পানামা খালের জলকপাটব্যবস্থা মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির পানি থেকে পাওয়া এই ব্যবস্থায় জাহাজকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০ ফুট ওপরে তুলে খালের নৌপথে নেওয়া হয়। পরে অন্য প্রান্তে আবার নামিয়ে সমুদ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এল-নিনোর কারণে খরার সময় পানির স্তর কমে গেলে জাহাজের ওজন কমাতে পণ্য নামাতে হয়। অন্যথায় খালের তলদেশে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

খালের প্রধান জলাধার গাতুন হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। জাহাজগুলো প্রায় ২০ মাইল পথ এই কৃত্রিম হ্রদ দিয়ে পাড়ি দেয়। পানির গভীরতা কমলে পুরো বোঝাই জাহাজ খাল পার হতে পারে না।

স্বাভাবিক সময়ে পুরো পণ্যবোঝাই জাহাজও জলকপাটব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারে। কিন্তু খরার সময় পানির স্তর কমে গেলে পণ্য কমানোর পাশাপাশি কমসংখ্যক জাহাজকে পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয়।

খালের জলাধার ও হ্রদে পর্যাপ্ত পানি রাখা জরুরি। জলকপাট পূরণে এই পানি ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে এসব জলাধার পানামার মানুষের পানীয় জলেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

গাতুন হ্রদের পানির স্তর কমার সঙ্গে মিঠাপানির সারচার্জ বাড়ে। পানামা খালের চেয়ারম্যান ও দেশটির খালবিষয়ক মন্ত্রী হোসে রামোন ইকাসা জানান, এই সারচার্জ খাল ব্যবহারের মাশুলের ওপর ১ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

খাল কর্তৃপক্ষ তিন মাসের পূর্বাভাস দেয়। এতে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই জানতে পারে, কত বড় জাহাজ কখন খাল পার হতে পারবে এবং সম্ভাব্য খরচ কত হবে।

তবে নিলামের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট দিনে খাল ব্যবহারের জরুরি প্রয়োজন থাকলে নিলামের মাধ্যমে সূচির দাম নির্ধারিত হয়

পানামার অর্থনীতিতে খালের বড় ভূমিকা

পানামার অর্থনীতিতে পানামা খালের অবদান বড়। দেশটির অর্থনীতির প্রায় ৬ শতাংশ এই খাল থেকে আসে। সরকারের রাজস্বেরও উল্লেখযোগ্য অংশ আসে খাল থেকে। খাল থেকে পাওয়া আয় সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। বছরে এর পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পানামা খালের বাড়তি মাশুলের সরাসরি প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও সেখানে পণ্য পরিবহনের একাধিক পথ রয়েছে। ফলে পানামা খালের মাশুল বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরির সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18141 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 03:18:00 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh