• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে | বাণিজ্য > বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি সেফটি জুতা

বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি সেফটি জুতা

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৮
  • ১১

---

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশে তৈরি সেফটি ও ফাংশনাল জুতা এখন বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। খনি, ভারী শিল্প, নির্মাণকাজ, নৌযান, পর্বতারোহণ ও সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য এসব জুতা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

প্রায় ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে টিম্বারল্যান্ড, আরিয়াতসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য বিশেষায়িত সেফটি জুতা তৈরি করছে গোল্ডেন চ্যাং ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি লিমিটেড। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ফাংশনাল ও সেফটি জুতা উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম বড় উৎপাদনকারী হিসেবে কাজ করছে।

১৯৫৩ সালে ফুজিয়ান-তাইওয়ান লেদার ফ্যাক্টরি হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। পরে ধীরে ধীরে ফাংশনাল ও সেফটি জুতা উৎপাদনে বিশেষ মনোযোগ দেয় গোল্ডেন চ্যাং।

প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি পরবর্তী সময়ে সুফল বয়ে এনেছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির অপারেশনস ম্যানেজার টনি হেশিয়েহ।

চলতি মাসের শুরুতে কোম্পানির কর্ণফুলী ইপিজেড কারখানায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটি সঠিক ও ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি জানান, উচ্চ মজুরি, শ্রমিক নিয়োগে জটিলতা, উচ্চ কর এবং আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভিয়েতনামে কোম্পানির কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে।

মাটির গভীরের খনি থেকে পর্বত পর্যন্ত

বাংলাদেশে গোল্ডেন চ্যাংয়ের চারটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে এবং দুটি কুমিল্লা ইপিজেডে অবস্থিত।

এসব কারখানায় বছরে প্রায় ১ কোটি জোড়া জুতা তৈরি হয়। এতে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। গত অর্থবছরে এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশের রপ্তানি আয়ে ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছে।

কোম্পানিটির তথ্যমতে, কর্ণফুলী ইপিজেডে তাইওয়ানভিত্তিক বিনিয়োগকারীর সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড নামে দুটি কারখানা রয়েছে। কুমিল্লা ইপিজেডে সিন চ্যাং এবং গোল্ডেন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেড নামে আরও দুটি কারখানা রয়েছে।

এসব কারখানায় লেদার-আপার, রাবার ও প্লাস্টিকের জুতা, ওয়াটারপ্রুফ জুতা ও বুট এবং অ্যালুমিনিয়াম-টো সেফটি জুতাসহ বিভিন্ন ধরনের সেফটি জুতা তৈরি করা হয়।

টিম্বারল্যান্ডের প্রিমিয়াম ওয়াটারপ্রুফ আউটডোর বুট নির্মাণকাজে টেকসই সেফটি জুতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আরিয়াত তৈরি করে প্রিমিয়াম কাউবয় বুট, বিশেষায়িত রাইডিং বুট এবং খামার ও ভারী শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী জুতা।

কর্ণফুলী ইপিজেডের দুটি কারখানায় তৈরি ৫০ লাখ জোড়া জুতার ৫০ শতাংশ টিম্বারল্যান্ড এবং ৩০ শতাংশ আরিয়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে কুমিল্লা ইপিজেডের দুটি কারখানায় তৈরি ৫০ লাখ জোড়া জুতার ৭০ শতাংশ উলভারিন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তেল ও গ্যাস উত্তোলন, কেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং মাটির গভীরের খনির মতো ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে কর্মরতদের সুরক্ষায় ব্যবহারের জন্য সেফটি জুতা তৈরির ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডটি পরিচিত।

এ ছাড়া গোল্ডেন চ্যাংয়ের বাংলাদেশের কারখানায় নরওয়ের ব্র্যান্ড হেলি হ্যানসেনের জন্যও জুতা তৈরি হয়। নাবিক, পর্বতারোহী ও শিল্পকারখানের শ্রমিকদের জন্য ওয়াটারপ্রুফ সেফটি জুতা তৈরির জন্য ব্র্যান্ডটি পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের বেলভিলের জন্য মিলিটারি ও ট্যাকটিক্যাল বুট তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে মিলিটারি ফুটওয়্যার ব্র্যান্ড ৫.১১ ট্যাকটিক্যাল, কারহার্ট, কোডিয়াক, ড্যান পোস্ট ও পেপরাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতাও তৈরি করা হয়।

কর্ণফুলী ইপিজেডের সিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেডের এইচআর ও কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার মো. আরিফুর রহমান জানান, তাঁদের কারখানায় তৈরি প্রিমিয়াম সেফটি জুতার ব্র্যান্ডগুলো গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি জোড়া ১৫০ থেকে ৩০০ ডলারে বিক্রি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ বাংলাদেশি রপ্তানিকারক

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিকারকদের মধ্যে শীর্ষ পাঁচে ছিল গোল্ডেন চ্যাং শুজ।

ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির মোট রপ্তানি আয়ের ৭১ শতাংশ বা ১০০ মিলিয়ন ডলার এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও রপ্তানি হয়।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ইপিজেডের কারখানা থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করে।

এরপর প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ১০৬ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রাবারের সোল ও পিওর লেদারের তৈরি বিশেষায়িত বুট বা সেফটি জুতা রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট ৪৩৩ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

এর মধ্যে শুধু গোল্ডেন চ্যাং গ্রুপের রপ্তানি আয় ছিল ২৫১ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এসব পণ্যের মোট রপ্তানির প্রায় ৫৮ শতাংশ এসেছে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে।

শ্রমনির্ভর শিল্পে বড় কর্মসংস্থান

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালের জুলাইয়ে কুমিল্লা ইপিজেডে সিন চ্যাং শুজ নামে বাংলাদেশে প্রথম কারখানা চালু করে। তখন এতে বিনিয়োগ ছিল ১ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলার এবং কর্মী ছিলেন মাত্র ১৪ জন।

এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে আরও একটি কারখানা ভবন নির্মাণ করছে কোম্পানিটি।

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে চারটি কারখানায় প্রতিষ্ঠানটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার। এসব কারখানায় ১২ হাজার ৪৬২ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে।

দ্রুত বাড়ছে বৈশ্বিক বাজার

ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস, গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ, মরডর ইন্টেলিজেন্স এবং রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের বাজার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ফুটওয়্যার বা শিল্প খাতের সুরক্ষামূলক জুতার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, বর্তমানে ১২ বিলিয়ন থেকে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের এই বাজার ২০৩০ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১৬ বিলিয়ন থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্ববাজারে সেফটি ও ফাংশনাল জুতার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বিশেষায়িত জুতা উৎপাদনে দেশের শিল্প খাতের অংশগ্রহণ আরও বাড়ছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18139 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 04:08:15 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh