
ইবি রিপোর্ট
ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রস্তুতি জোরদারে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সংহতি, জীবন রক্ষাকারী স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে এ বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের অংশ হিসেবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সম্মেলন কক্ষ-১-এ এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ভবিষ্যৎ মহামারি ও জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী করাই ছিল বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোভিড-১৯ মহামারি দেখিয়েছে একটি স্বাস্থ্য সংকট কত দ্রুত বড় ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সংকটে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে মহামারির সময় বিভিন্ন দেশের মধ্যে টিকা, রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য প্রযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্যও প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশ মনে করে, কোভিড-১৯ থেকে পাওয়া শিক্ষা শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। মহামারির তাৎক্ষণিক প্রভাব কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতির বিষয়টি যেন গুরুত্ব না হারায়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তায় বলা হয়, শক্তিশালী ও সহনশীল জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই মহামারি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক মহামারি প্রস্তুতির কাঠামোয় সমতাকে মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। কোনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষাকারী টিকা, ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যপণ্য যেন আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, ওষুধ, রোগ নির্ণয় সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন দেশে উৎপাদন সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার মাধ্যমে মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি শক্তিশালী করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এতে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতাও বাড়বে বলে বাংলাদেশের বার্তায় বলা হয়।
মহামারি প্রস্তুতির জন্য নির্ভরযোগ্য ও টেকসই অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তুতিতে বিনিয়োগকে শুধু জরুরি পরিস্থিতির ব্যয় হিসেবে না দেখে মানবনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ আরও বলেছে, মহামারি প্রস্তুতিতে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার তুলে ধরে এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রোগ নজরদারি ও পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে। সমতা, সংহতি, যৌথ দায়িত্ব ও সম্মিলিত কার্যক্রমের ভিত্তিতে বৈশ্বিক মহামারি প্রস্তুতির কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটির প্রতিপাদ্য ছিল— “সমতা ও সংহতির নীতির মাধ্যমে মহামারি ও জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় ও আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক পদ্ধতি জোরদার করা।”
বাংলাদেশের বক্তব্যের সমাপনী অংশে এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, পরবর্তী মহামারি থেকে কোনো দেশ একা নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে না। এজন্য প্রতিটি দেশকে নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব আরও সম্মিলিতভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।