• হোম > অর্থনীতি | দেশজুড়ে > সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা, ১ হাজার ৪৮৫ পদের জন্য আবেদন ২১ লাখ ২৩ হাজার

সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা, ১ হাজার ৪৮৫ পদের জন্য আবেদন ২১ লাখ ২৩ হাজার

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:০৩
  • ১৬

---

 

ইবি রিপোর্ট

দেশে সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা যেন দিন দিন আরও বাড়ছে। বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরির সীমিত ও তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত সুযোগের প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহও বাড়ছে। এরই বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজার প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন। বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর এই চাপ সামাল দিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করতেই এখন হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

গত মে মাসে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২ ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। গত ২ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পদভেদে আবেদন ফি ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা, যা টেলিটকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন প্রার্থীরা।

আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রায় তিন মাস হতে চললেও এখনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে এবং প্রাথমিক বাছাইয়ের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কতজনকে রাখা হবে, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চেয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডের ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন পড়েছে। দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার উপায় প্রস্তাব করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া একটি নতুন অভিজ্ঞতা। ফলে পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিদর্শক নিয়োগ, উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ পুরো প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এর আগে কোনো নিয়োগে এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কতজনকে রাখা হবে, তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াটি তিন ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপগুলো হলো—লিখিত পরীক্ষা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা। পরীক্ষা গ্রহণের ব্যয় ও প্রক্রিয়া বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর কেন্দ্র ও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, আবেদন গ্রহণের পর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন পাওয়ায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই নিয়োগে জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা সাম্প্রতিক পাঁচটি সাধারণ বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটির আবেদনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সর্বশেষ ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থী। আগের ৪৯তম বিসিএসে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার। ৪৭তম, ৪৬তম ও ৪৫তম বিসিএসে আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৩ লাখ ৩৭ হাজার ও ৩ লাখ ৪৬ হাজার।

৪৮তম বিসিএস ছিল বিশেষ পরীক্ষা, যেখানে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ বিসিএসের সঙ্গে এই পরীক্ষার সরাসরি তুলনা করা হয় না।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন জমা পড়ায় সরকারি চাকরির প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহের মাত্রা নতুন করে সামনে এসেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি থেকে স্নাতক পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রার্থীদের জন্য পদ রাখা হয়েছে।

১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদ। এই পদে ৪৭৮ জন নিয়োগ দেওয়া হবে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি পাস চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১২ জন সমাজকর্মী নিয়োগ দেবে অধিদপ্তর। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করা। এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা উপবৃত্তির জন্য উপযুক্ত সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি ও যাচাইয়ের কাজ রয়েছে।

অন্যান্য পদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, প্রধান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর, সুপারভাইজার, কারিগরি প্রশিক্ষক ও অফিস সহায়ক।

অর্থনীতিবিদ ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে স্থবিরতার বিপরীতে সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই বিপুলসংখ্যক আবেদনে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ থমকে থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে প্রার্থীরা সরকারি চাকরির দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে পদ কম হলেও চাকরিপ্রত্যাশীদের আগ্রহ বেশি। তার মতে, করপোরেট খাতের সম্প্রসারণ হলে সরকারি চাকরিতে এত বেশি চাপ পড়ত না। বিনিয়োগ সংকোচন ও বিশ্ববাজারে পণ্য বিক্রির অনিশ্চয়তার কারণে করপোরেট খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গোলাম মোয়াজ্জেম সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগে থাকা পদগুলোর প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনারও পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্য পদ থাকার কারণেই উৎপাদনশীলতা কম হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো উৎপাদনশীলতা মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

বেসরকারি খাতের দুর্বলতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে দাঁড়ায়, যা জুনে ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ—রেকর্ড সর্বনিম্ন। তবে জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধিও ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

এর আগে মে, এপ্রিল ও মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৯৮, ৪ দশমিক ৭৫ ও ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।

গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীতিগত বিকল্প নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিকে ‘কর্মসংস্থান জরুরি অবস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণাটি উপস্থাপন করেন। পরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের বেকারত্ব পরিস্থিতিকে ‘মহামারি আকার’ ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিকোত্তর বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশ বেকার।

এদিকে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) গত বছর প্রাক্কলন করেছিল, আগের দুই বছরে তাদের সদস্য কোম্পানিগুলোর জনবল ৩ শতাংশ কমেছে। অস্থায়ী ও মৌসুমি কর্মীদের হিসাব ধরলে এই সংকোচনের হার ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

চাকরির বাজারের এই প্রবণতা অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্মের তথ্যেও দেখা গেছে। বিডিজবস ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) একেএম ফাহিম মাশরুর জানিয়েছিলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্ল্যাটফর্মটিতে চাকরির বিজ্ঞপ্তি ১০ শতাংশ কমেছিল।

তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি চাকরিতে আবেদন কমার বিপরীতে সরকারি চাকরিতে আবেদনের পরিমাণ বাড়ছে। বেসরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা খুব বেশি না বাড়া এবং সরকারি চাকরিতে নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে বেতন-ভাতা বাড়ার বিষয়টিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজার আবেদন সরকারি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং বেসরকারি কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে এবং দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে শেষ করা হবে, সেটিই কর্তৃপক্ষের সামনে বড় প্রশ্ন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/18106 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 04:09:04 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh