
ইবি রিপোর্ট
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের। ২০২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি রেকর্ড ১১২ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ কোটি টাকা। চার বছর আগে, ২০২২ অর্থবছরে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নের সঙ্গে বেসরকারি পুঁজি যুক্ত হয়ে ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মোট অর্থায়ন ও পুঁজি সংগ্রহ ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি শুধু কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন আয়ের অর্থনীতিতে এর পরিমাণ বেড়েছে। তবে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই বৃদ্ধি ছিল বেশি।
নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ২০২২ অর্থবছরে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ হয়েছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ চার বছরে প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি আরও বেশি। সেখানে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে তা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কঠিন পরিবেশের নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
আফ্রিকাতেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। পুরো মহাদেশে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ ২০২২ অর্থবছরের প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মতে, গত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে নেওয়া বিভিন্ন পরিবর্তন এই অগ্রগতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। কাজের গতি বাড়ানো, প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি দেশে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি একক যোগাযোগব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশভেদে প্রয়োজন ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত কৌশল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
‘বেসরকারি খাত বিনিয়োগ ল্যাব’ এই প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের বাস্তব বাধাগুলো চিহ্নিত করেছে। সেগুলো দূর করার জন্য কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্যারান্টি বাড়ানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ইক্যুইটি অর্থায়নের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
শুধু বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ নয়, গ্যারান্টি দেওয়ার ক্ষেত্রেও রেকর্ড করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। ২০২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি গ্যারান্টি দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের গ্যারান্টি দেওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, নির্ধারিত সময়ের চার বছর আগেই তা ছাড়িয়ে গেছে।
এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে ২০২৪ সালে তৈরি করা বিশ্বব্যাংক গ্রুপ গ্যারান্টি প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে ক্লায়েন্ট ও বিনিয়োগকারীরা পুরো প্রতিষ্ঠান থেকে গ্যারান্টি পণ্য পাওয়ার জন্য একটি একক ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারছেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, তিন বছর আগে অংশীদার ও ক্লায়েন্টরা বেসরকারি পুঁজি আরও বেশি কাজে লাগানোর দাবি জানিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্য পূরণে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ তার কাজের ধরন বদলেছে। এখন কাজের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, পুঁজি সংগ্রহের পরিমাণ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা এমন জায়গায় বিনিয়োগ হবে যেখানে নতুন সুযোগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
কর্মসংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ
বেসরকারি পুঁজি বাড়ানোর পেছনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সংস্থাটির হিসাবে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। অথচ একই সময়ে প্রায় ৪২ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ব্যবধান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব অর্থনীতিতে প্রতি ১০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে ৯টিই সৃষ্টি করে বেসরকারি খাত। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
সংস্থাটির কর্মসংস্থান কৌশলের তিনটি মূল ভিত্তি হলো মানবসম্পদ ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি এবং বেসরকারি খাতকে বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়া।
পাঁচ খাতে বিনিয়োগে জোর
এই লক্ষ্য পূরণে পাঁচটি কর্মসংস্থাননির্ভর খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো অবকাঠামো ও জ্বালানি, কৃষিব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদন।
২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নিজস্ব অর্থায়ন ও সংগৃহীত পুঁজির ৫৫ শতাংশ এসব খাতে গেছে। সংস্থাটির লক্ষ্য হলো শক্তিশালী অবকাঠামো ও উন্নত নীতিকে বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বেসরকারি পুঁজি যেন শুধু অপেক্ষাকৃত সহজ বাজারে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নিম্ন আয়ের অর্থনীতিতেও পৌঁছায়। স্থানীয় ও আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদেরও এই প্রক্রিয়ায় আরও যুক্ত করার চেষ্টা করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির দিকে নজর
পরবর্তী পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। ‘অরিজিনেট-টু-ডিস্ট্রিবিউট’ কার্যক্রমের মাধ্যমে বড় আকারে বিনিয়োগ প্যাকেজ তৈরি করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির বড় উৎসগুলোকে উন্নয়নশীল অর্থনীতির বিনিয়োগের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নতুন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু শুধু বেশি অর্থ সংগ্রহ নয়। সেই অর্থকে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করাই এখন বড় লক্ষ্য। রেকর্ড পুঁজি সংগ্রহের পর সেই পুঁজি কতটা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগে রূপ নেয়, সেটিই হবে পরবর্তী ধাপের মূল বিষয়। তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, প্রেস বিজ্ঞপ্তি