• হোম > মতামত > পরীক্ষা ছাড়াই এত চাকরি!

পরীক্ষা ছাড়াই এত চাকরি!

  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১৫
  • ৩৩

---

আহমেদ তোফায়েল

একটি ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার স্বাভাবিক পথটি খুব পরিচিত—বিজ্ঞপ্তি হবে, যোগ্য প্রার্থীরা আবেদন করবেন, পরীক্ষা হবে, মেধার ভিত্তিতে বাছাই হবে। এই প্রক্রিয়ায় চাকরি পাওয়া একজন প্রার্থীর জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি আস্থার বিষয়। কিন্তু কোনো ব্যাংকের নিয়োগব্যবস্থা যদি এই স্বাভাবিক পথ থেকে সরে যায়, তখন প্রশ্নটি শুধু কয়েকজন কর্মীর চাকরি পাওয়া বা হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে প্রতিষ্ঠানের শাসনব্যবস্থা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ব্যাংকটিতে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে বিজ্ঞপ্তি ও নিয়মিত পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আরও দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশের বাড়ি চট্টগ্রামে। ৮ হাজার ৯৯ জন ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা এবং তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনের বাড়ি পটিয়ায়।

এখানে সংখ্যাগুলোই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের প্রক্রিয়া কীভাবে এমন পর্যায়ে গেল, যেখানে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক বাছাইয়ের পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ ও বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হলো?

ব্যাংকের চাকরি অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের চাকরির মতো নয়। একজন কর্মকর্তা শুধু নিজের কাজই করেন না; তিনি আমানত গ্রহণ, ঋণ বিতরণ, হিসাব পরিচালনা, গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণসহ নানা আর্থিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে নিয়োগে যোগ্যতা ও দক্ষতার যাচাই দুর্বল হলে তার প্রভাব পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়তে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও পরীক্ষা নেওয়ার বিধান ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের পর জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে নীতিমালায় বিশেষ শিথিলতার একটি সুযোগ যুক্ত করা হয়। পরে সেই সুযোগ ব্যবহার করে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নীতিমালায় কোনো বিশেষ পরিস্থিতির জন্য ছাড় রাখা আর সেই ছাড়কে নিয়মিত নিয়োগের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। প্রথমটির উদ্দেশ্য হতে পারে জরুরি প্রয়োজন সামাল দেওয়া। দ্বিতীয়টি হলে স্বাভাবিক নিয়োগব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অন্তত এমন একটি প্রশ্ন সামনে আনে—ব্যতিক্রমের বিধান কি ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হয়েছিল?

নিয়োগের যে পদ্ধতির কথা প্রতিবেদনে এসেছে, সেটি আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে। বলা হয়েছে, চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত চট্টগ্রামের পটিয়ায় এস আলমের বাড়ি এবং আছদগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে রাখা বিশেষ বাক্সে জমা নেওয়া হতো। বাক্সগুলোর নামও ছিল আলাদা—পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ ক্যাশ, মহিলা ক্যাশ, পিয়ন-ডিপ্লোমা ইত্যাদি।

এরপর বাছাই করা প্রার্থীদের তালিকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো এবং সেখান থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়নপত্রও মানবসম্পদ বিভাগে পাওয়া যায়নি।

এখানেই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থার পার্থক্যটি সামনে আসে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সিদ্ধান্ত যদি নথিভুক্ত যোগ্যতা, পরীক্ষা ও নির্ধারিত বোর্ডের পরিবর্তে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পছন্দের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আর একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় অন্য চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে। যারা বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রস্তুতি নিয়েছেন, পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে একই প্রতিযোগিতায় না গিয়ে অন্য কেউ চাকরি পেলে সেই বৈষম্যের দায় কোথায়?

শুধু নিচের পদ নয়, ওপরের পদেও প্রশ্ন

বিষয়টি আরও বিস্তৃত কারণ প্রতিবেদনে শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পদেও একই ধরনের নিয়োগের কথা এসেছে।

অর্থাৎ সমস্যাটি যদি সত্যিই ব্যাপক হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে শুধু মানবসম্পদ বিভাগের একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। একটি ব্যাংকের ওপরের স্তরে নিয়োগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কৌশল নির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তও জড়িয়ে থাকে।

তবে এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। ইসলামী ব্যাংকে ২০১৭ সালের আগেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া সরাসরি নিয়োগের কিছু নজির ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ সুপারিশে ১০ জনকে নিয়োগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। অর্থাৎ নিয়োগে অনিয়মের সংস্কৃতি কোনো একদিনে তৈরি হয়েছে—এমন সরল ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগব্যবস্থায় ব্যতিক্রমের সুযোগ কীভাবে তৈরি ও ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

চাকরিচ্যুতি কি সমস্যার সমাধান?

২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ আগের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের যোগ্যতা পুনঃ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়।

প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে পরীক্ষার আওতায় আনা হলেও অংশ নেন মাত্র ৪০২ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিক্ষোভ এবং ব্যাংকের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না করে তিন মাসের বেতন দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

এখানে সমস্যাটি অন্য জায়গায়। যদি আগের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, চাকরির মেয়াদ, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং নিয়োগের প্রক্রিয়াও আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার।

কারণ একটি ভুল নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া এবং চাকরির দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হওয়া একই বিষয় নয়। আবার নিয়োগের প্রক্রিয়া অনিয়মিত হলেও প্রত্যেক কর্মী যে সেই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না।

সামনে দরকার নিয়মের পুনর্গঠন

ইসলামী ব্যাংকের ঘটনা তাই শুধু ৮ হাজার ৫৪২ জনের নিয়োগের হিসাব নয়। এটি ব্যাংকের নিয়োগব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

সমাধানের প্রথম ধাপ হতে পারে প্রতিটি নিয়োগের নথি পুনরায় যাচাই করা। কোন পদে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, বিজ্ঞপ্তি ছিল কি না, পরীক্ষা হয়েছে কি না, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কে ছিলেন—এসব তথ্য আলাদা করে সংরক্ষণ করা দরকার। যাঁদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় আলাদা করতে হবে।

একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ ছাড়ের বিধান থাকলে সেটির ব্যবহারও কঠোরভাবে নথিভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। জরুরি নিয়োগের কারণ, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, প্রার্থীর যোগ্যতা এবং নিয়োগের পরবর্তী যাচাই—সবকিছুর লিখিত রেকর্ড থাকা উচিত।

ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ শুধু একটি চাকরির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান এবং গ্রাহকের আস্থা। তাই অতীতের অনিয়মের বিচার যেমন দরকার, তেমনি দরকার এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা অঞ্চল নিয়োগের প্রক্রিয়াকে নিজের মতো করে পরিচালনা করতে না পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল: ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার অধিকার কার—যিনি যোগ্য, নাকি যাঁর পরিচিতি শক্তিশালী? একটি সুস্থ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উত্তরও সরল হওয়া উচিত। নিয়োগের দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে, আর ভেতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত হবে নির্ধারিত যোগ্যতা, পরীক্ষা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনটিই সামনে এনেছে।

লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17947 ,   Print Date & Time: Wednesday, 23 September 2026, 11:13:43 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh