• হোম > উদ্যোক্তা | এন্টারপ্রেনার > গ্রামের নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায়

গ্রামের নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায়

  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৪
  • ২৮

---

ইবি রিপোর্ট

রংপুরের তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামের সকাল এখন আগের মতো নয়। মহাসড়কের পাশে সাড়ে ৯ একর জমিতে গড়ে ওঠা একটি কারখানা থেকে ভেসে আসে যন্ত্রের শব্দ। কোথাও জুতা কাটার কাজ চলছে, কোথাও সেলাই, কোথাও আবার প্যাকেটজাত করা হচ্ছে তৈরি পণ্য। সারি সারি কর্মীর মধ্যে বড় অংশই নারী।

এই নারীদের অনেকেরই আগে নিয়মিত আয় ছিল না। কেউ সংসারের খরচ চালাতে ধারদেনা করতেন, কেউ ঢাকায় গিয়ে কাজ করতেন। এখন তাঁদের একটি অংশ নিজের গ্রামেই কাজ করছেন। সেই কাজের বিনিময়ে পাওয়া আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি কেউ সঞ্চয় করছেন, কেউ গবাদিপশু পালন করছেন, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাচ্ছেন।

আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে গ্রামের বাইরের বাজারে। তারাগঞ্জে তৈরি এই জুতা এখন যাচ্ছে পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। অর্থাৎ যে গ্রামের নারীরা একসময় নিজেদের জীবিকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতেন, তাঁদের শ্রমে তৈরি পণ্য এখন পৌঁছে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

প্রবাস থেকে দেশে, তারপর গ্রামে শিল্প:

ঘনিরামপুরে এই শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে দুই ভাইয়ের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের গল্প। মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁরা আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরে দেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেন।

সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০০৯ সালে নীলফামারীতে এবং ২০১২ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরে তাঁরা হিমাগার স্থাপন করেন। এরপর ২০১৭ সালে তারাগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন রপ্তানিমুখী জুতার কারখানা ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস।

দুই ভাই মিলে কারখানাটিতে বিনিয়োগ করেন প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু একটি ব্যবসা গড়ে তোলা নয়; স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে কারখানা প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরই বড় ভাই মো. সেলিম মারা যান। বর্তমানে মো. হাসানুজ্জামান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বড় ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল দেশে ফিরে কিছু করার এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার। সেই ভাবনা থেকেই শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী:

কারখানাটিতে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরাই এখানে বেশি কাজ করছেন। কারখানার শ্রমিক কল্যাণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার পর এলাকার বেকারত্বও কমেছে। নারীদের বড় অংশ হওয়ায় তাঁদের জন্য আলাদা কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী শ্রমিকদের কাজ তদারক করতে নারী সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়েছে।

কারখানার কর্মীদের অনেকেই আগে অন্য এলাকায় কাজ করতেন। বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের অন্তত ৫১০ জন আগে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করতেন। কারখানা চালু হওয়ার পর তাঁরা সেই কাজ ছেড়ে নিজেদের এলাকায় ফিরে এসেছেন।

এতে শুধু কর্মসংস্থানের জায়গাটিই বদলায়নি, বদলেছে জীবনযাপনের ধরনও। বাইরে কাজ করা নারীদের অনেকের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও খাবারের পেছনে আয়ের বড় অংশ চলে যেত। গ্রামের কারখানায় কাজ পাওয়ায় তাঁদের একটি অংশ এখন পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি আয়ও করতে পারছেন।

ধারদেনা থেকে সঞ্চয়ের পথে:

ঘনিরামপুর গ্রামের শ্রমিক লাভলী বেগমের জীবনের পরিবর্তনটি এই রূপান্তরের একটি উদাহরণ। কারখানাটি হওয়ার আগে সংসার চালাতে তাঁকে ধারদেনা ও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতো। পরে কারখানায় প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করেন।

এখন তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ধারদেনার প্রয়োজন কমেছে। বরং প্রতি মাসে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারছেন। তাঁর মতো এলাকার আরও অনেক নারী আয় করায় পরিবারে তাঁদের অবস্থানও বদলেছে।

আরেক শ্রমিক আদুরি রানী আগে ঢাকায় কাজ করতেন। দিনের বড় সময় বাইরে কাটিয়ে যে আয় করতেন, তার বড় অংশ ব্যয় হয়ে যেত বাসাভাড়া ও খাওয়াদাওয়ায়। এখন নিজের এলাকায় ফিরে এসে কাজ করছেন। কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরে সংসারের কাজও করতে পারছেন। আয়ের একটি অংশ দিয়ে গরু-ছাগল পালনও শুরু করেছেন।

এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু একজন শ্রমিকের হাতে টাকা আসা নয়। পরিবারের আয় বাড়লে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। নারীর নিজস্ব আয় পরিবারে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে—তবে এ বিষয়ে কারখানার দেওয়া তথ্যের বাইরে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান নেই।

একটি কারখানাকে ঘিরে বদলে গেছে বাজার:

কারখানার প্রভাব শুধু শ্রমিকদের পরিবারেই থেমে নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেও এর প্রভাব পড়েছে।

ঘনিরামপুর বেলতলী বাজারের একজন সবজি ব্যবসায়ীর ভাষ্য, কারখানা চালুর পর বাজারটি আগের চেয়ে বেশি জমজমাট হয়েছে। স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ায় বিভিন্ন দোকানের বেচাকেনাও বেড়েছে।

অর্থনীতির ভাষায়, একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলে তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানটির সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শ্রমিকেরা যে আয় করেন, তার একটি অংশ স্থানীয় বাজারে ব্যয় হয়। এতে খাবার, পোশাক, পরিবহন ও অন্যান্য পণ্যের চাহিদা বাড়ে। ফলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসারও প্রসার ঘটতে পারে।

তারাগঞ্জের ঘনিরামপুরে কারখানাটিকে ঘিরে বাজারের বেচাকেনা বাড়ার যে অভিজ্ঞতার কথা স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সেটিই তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

শ্রমিক থেকে দক্ষ কর্মী:

কারখানাটিতে শুধু চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থাই নেই, নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণকালীন ভাতাও দেওয়া হয়। এর ফলে অদক্ষ কর্মীরা ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন।

শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরিকাঠামো অনুসরণ করে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকেও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।

অর্থাৎ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা তৈরির একটি প্রক্রিয়াও এখানে তৈরি হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিকদের জন্য এর অর্থ হলো, গ্রামের কাছেই কাজ শেখার এবং সেই দক্ষতার বিনিময়ে আয় করার সুযোগ তৈরি হওয়া।

গ্রামের কারখানা থেকে বিশ্ববাজারে:

ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস মূলত সিনথেটিক জুতা উৎপাদন করে। বর্তমানে দুটি ইউনিটে উৎপাদন চলছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার জোড়া।

এই উৎপাদিত জুতার বাজার শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। পণ্যের মান নিশ্চিত করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন।

২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস।

রপ্তানিমুখী এই উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে গ্রামের শ্রমিকের শ্রম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একটি গ্রামের কারখানায় তৈরি পণ্য যখন বিদেশের ক্রেতার কাছে পৌঁছে, তখন সেই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, স্থানীয় সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীরাও বৃহত্তর বাজারের অংশ হয়ে ওঠেন।

সামনে আরও বড় হওয়ার পরিকল্পনা:

বর্তমানে কারখানাটিতে দুটি ইউনিট চালু আছে। আরও একটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রসারণের পর কর্মসংস্থানের পরিমাণও বড় আকারে বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এর ৮০ শতাংশই নারী হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কারখানাটির কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের পরিধি বর্তমানের তুলনায় অনেক বড় হবে। তবে সেই সম্প্রসারণ বাস্তবে কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও উৎপাদন কার্যক্রমের ওপর।

শিল্পায়নের নতুন ঠিকানা কি গ্রাম?

বাংলাদেশে শিল্প বলতে দীর্ঘদিন ধরে বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক একটি ধারণাই বেশি পরিচিত। তারাগঞ্জের ঘনিরামপুরের এই কারখানার গল্প সেই ধারণার বাইরে একটি উদাহরণ দেখায়।

এখানে প্রবাসফেরত উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, নারীর অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানি—সবকিছু একই জায়গায় যুক্ত হয়েছে।

স্থানীয় কুশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ভাষায়, সঠিক বিনিয়োগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে গ্রামেও শিল্পায়ন সম্ভব। তাঁর মতে, কারখানাটি শুধু জুতা তৈরি করছে না; স্থানীয় মানুষের আত্মমর্যাদা ও সম্ভাবনারও নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

ঘনিরামপুরের নারীদের গল্পে তাই একটি বড় প্রশ্নও উঠে আসে—শিল্পের সুযোগ যদি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষকে সব সময় শহরমুখী হতে হবে কি?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই চূড়ান্তভাবে দেওয়া যায় না। তবে তারাগঞ্জের কারখানার যন্ত্রের শব্দ, তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক এবং ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে যাওয়া জুতাগুলো একটি বিষয় দেখিয়ে দিচ্ছে—শিল্প শুধু শহরেই গড়ে উঠতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

একসময় যে গ্রামের নারীদের আয় করার সুযোগ সীমিত ছিল, তাঁদের হাতেই এখন তৈরি হচ্ছে বিদেশের বাজারের জন্য জুতা। সেই আয় যাচ্ছে তাঁদের পরিবারে, সেই অর্থ ঘুরছে স্থানীয় বাজারে। আর গ্রামের মাটিতে তৈরি পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে।

ঘনিরামপুরের গল্প তাই শুধু একটি জুতার কারখানার গল্প নয়। এটি দেখায়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও নারীর অংশগ্রহণ এক জায়গায় মিললে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান কীভাবে একটি গ্রামের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17869 ,   Print Date & Time: Tuesday, 22 September 2026, 04:11:55 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh