• হোম > ইন্টাপ্রেনিউর | উদ্যোক্তা | ওমেন এন্টারপ্রেনার > ফেলে দেওয়া উপকরণে বদলে গেল ৫০০ নারীর জীবন

ফেলে দেওয়া উপকরণে বদলে গেল ৫০০ নারীর জীবন

  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২৪
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

মাগুরার একটি গ্রামে গাছের ডাল, পাতা, ঘাস আর পেঁপের নল নিয়ে ব্যস্ত কয়েক শ নারী। কারও হাতে কাপড় ও চামড়া। কেউ ঘাস বুনে তৈরি করছেন পাখির বাসা। কেউ শুকাচ্ছেন শজনের ডাঁটা ও পাতা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, গ্রামের সাধারণ কোনো কাজ চলছে। কিন্তু এই উপকরণগুলোই কিছুক্ষণ পর রূপ নিচ্ছে পোষা প্রাণীর খাবার, খেলনা ও নানা সামগ্রীতে। এরপর সেগুলো পাড়ি দিচ্ছে জাপান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে।

মাগুরা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের আঙ্গারদাহ গ্রামে গড়ে উঠেছে এমনই একটি কারখানা। উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম। তাঁর প্রতিষ্ঠান বোল্ড পার্টনারস লিমিটেডে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে পোষা প্রাণীর প্রায় ৪০০ ধরনের খাবার ও খেলনা। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরুর পর এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

এই উদ্যোগের গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা গড়ে তোলার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামের নারীর কর্মসংস্থান, স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয় এবং এমন কিছু উপকরণের নতুন ব্যবহার, যেগুলো সাধারণত খুব বেশি মূল্য বহন করে না।

মাত্র চার-পাঁচজন কর্মী দিয়ে শুরু

মাগুরা শহরের কেশব মোড় এলাকায় জন্ম নেওয়া সাউয়াদা ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরে পারিবারিক কারণে জাপানে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের জীবন ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমিতে।

দেশে ফিরে কী করবেন, সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় নতুন পথচলা। পোষা প্রাণীর প্রতি আগ্রহ তাঁকে এ ধরনের পণ্য তৈরির দিকে নিয়ে যায়। ২০১৮ সালে মাত্র চার-পাঁচজন কর্মী নিয়ে বোল্ড পার্টনারস লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। তখন তৈরি করা হতো মাত্র দুই ধরনের খেলনা।

প্রথম বছরেই জাপানে তিন হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। প্রয়োজন হয় আরও কর্মীর। আর সেখানেই সাউয়াদা স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অগ্রাধিকার দেন।

কারখানাতেই তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের উপযোগী করে তোলা হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উৎপাদন ও কর্মীর সংখ্যা। পরবর্তী সময়ে জাপান ও সিঙ্গাপুরের দুটি প্রতিষ্ঠানও বোল্ড পার্টনারস লিমিটেডে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে।

সাউয়াদার কাছে ব্যবসার উদ্দেশ্য কেবল নিজের জন্য আয় করা নয়। তাঁর ভাষায়, জন্মভূমির প্রতি মানুষের একটি ঋণ থাকে। মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির মধ্য দিয়ে সেই ঋণ শোধ করতে চান তিনি। তাঁর উদ্যোগে সেই ভাবনারই বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে।

পেঁপের নল থেকে খাবার, নিমের ডাল দাঁত পরিষ্কারে

প্রায় ২৫ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে প্রকল্পটি। সেখানে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনার কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন গাছ ও ঘাসও লাগানো হয়েছে।

কারখানাটিতে রয়েছে চারটি আলাদা অংশ। একটি অংশে তৈরি হয় পোষা প্রাণীর পোশাক। আরেকটিতে কুকুর-বিড়ালের খেলনা। তৃতীয় অংশে তৈরি হয় খাবার ও নানা ধরনের খাবারজাত পণ্য। অন্য অংশে ঘাস দিয়ে খরগোশ, গিনিপিগ ও ইঁদুরের খাবার ও খেলনা তৈরি করা হয়।

পেঁপের নল প্রক্রিয়াজাত করে খরগোশ, গিনিপিগ ও হ্যামস্টারের খাবার তৈরি করা হয়। আবার কুকুরের দাঁত পরিষ্কারের জন্য ব্যবহার করা হয় নিমের ডাল। কুকুর সেই ডাল চিবিয়ে ফেলে দেয়। ঘাস দিয়ে তৈরি ইঁদুরের ঘরও যাচ্ছে কানাডায়।

অর্থাৎ স্থানীয় পরিবেশে সহজে পাওয়া উপকরণকে একটু ভিন্নভাবে ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এমন পণ্য, যার ক্রেতা দেশের বাইরে।

গ্রামের ডাল-পাতাও এখন নগদ টাকা

কারখানার উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু নিজেদের জমির কাঁচামালে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও কাঁচামাল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পেঁপের নল, আম ও নিমের চিকন ডাল কিংবা ঘাস—এ ধরনের উপকরণ কারখানায় নিয়ে এলেই নগদ টাকায় কিনে নেওয়া হয়। ফলে গ্রামের শতাধিক মানুষ এখন এসব সংগ্রহ করে কারখানায় বিক্রি করছেন।

যে উপকরণ আগে তেমন কোনো আর্থিক মূল্য তৈরি করত না, সেটিই এখন স্থানীয় মানুষের জন্য আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। এতে ব্যবসার পরিধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অর্থনীতির সঙ্গেও তৈরি হয়েছে একটি নতুন সংযোগ।

একদিকে কারখানার শ্রমিকেরা মজুরি পাচ্ছেন। অন্যদিকে কাঁচামাল সরবরাহকারীরাও আয় করছেন। অর্থাৎ একটি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষ আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

বাড়ির কাছেই কাজ, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ

বোল্ড পার্টনারস লিমিটেডের শুরু থেকেই কাজ করছেন সুপ্রিয়া রানী। তাঁর জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে এই উদ্যোগের প্রভাবের একটি দিক বোঝা যায়।

সুপ্রিয়া জানান, এই কাজ করে তিনি জমি কিনেছেন, বাড়ি করেছেন এবং সংসারের অনেক প্রয়োজন মেটাতে পেরেছেন। তাঁর কাছে বড় সুবিধা হলো—বাড়িতে থেকেই চাকরি করতে পারছেন।

এ ধরনের সুযোগ গ্রামীণ নারীদের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ দূরের শহরে গিয়ে কাজ করার পরিবর্তে নিজেদের এলাকার কাছাকাছি থেকেই তাঁরা আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের হিসাবে, প্রায় ২০০ নারী শ্রমিক কারখানায় সরাসরি কাজ করেন। তাঁদের যাতায়াতের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থাও রয়েছে। এর বাইরে আরও প্রায় ৩০০ নারী বাড়িতে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেন। সব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ স্থানীয় নারীর কর্মসংস্থানের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান যুক্ত।

৩৪ কোটি টাকার রপ্তানি

ব্যবসাটির বিস্তারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় রপ্তানির পরিসংখ্যানে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা হিসাবে এর মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পণ্য গেছে জাপানে। এরপর রয়েছে কানাডা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও রপ্তানি হচ্ছে।

অর্থাৎ মাগুরার একটি গ্রামের কারখানায় তৈরি পণ্য শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বাইরের ক্রেতার চাহিদা পূরণ করছে এসব পণ্য।

এখানে ব্যবসার আরেকটি দিকও সামনে আসে। রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য সব সময় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনতে হবে—এমন নয়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া উপকরণকেও যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত ও নকশা করে আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্য বানানো সম্ভব।

সামনে বড় বাজারের হাতছানি

সাউয়াদা ইসলামের মতে, বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনার বড় বাজার রয়েছে। বর্তমানে এই বাজারের বড় অংশ ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের দখলে। বাংলাদেশ এখনো সেখানে খুব সামান্য অবস্থানে রয়েছে।

তাঁর লক্ষ্য আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় এ ধরনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। তাঁর যুক্তি, বিশ্ববাজারের চাহিদা পূরণ করতে হলে সারা দেশে এমন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে।

মাগুরার এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার একটি ছোট উদাহরণ। এখানে ব্যবসা শুরু হয়েছে খুব অল্পসংখ্যক কর্মী দিয়ে। স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষ কাঁচামাল সরবরাহ করছেন। আর সেই কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্য চলে যাচ্ছে বিদেশে।

গল্পটি তাই শুধু পোষা প্রাণীর খেলনা তৈরির নয়। এর ভেতরে রয়েছে স্থানীয় সম্পদের নতুন ব্যবহার, নারীর আয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির একটি সম্ভাব্য পথ।

একসময় যে পেঁপের নল, আম-নিমের চিকন ডাল কিংবা ঘাস গ্রামের মানুষের চোখে ছিল সাধারণ উপকরণ, সেগুলোই এখন মাগুরার একটি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে বৈদেশিক বাজারে যাচ্ছে। সেই যাত্রায় তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, বাড়ছে স্থানীয় মানুষের আয়। আর একজন উদ্যোক্তার উদ্যোগ দেখাচ্ছে—বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর শুরুটা কখনো কখনো হতে পারে নিজের গ্রামের মাটি থেকেই


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17867 ,   Print Date & Time: Tuesday, 22 September 2026, 04:10:59 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh