
ইবি রিপোর্ট
সারের সংকট ও বাড়তি দামের চাপের মধ্যেই কৃষকের সামনে এসেছে জ্বালানির নতুন বোঝা। আমন মৌসুমে যখন উৎপাদন খরচ নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে, তখন ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে চলতি আমনের পাশাপাশি সামনে থাকা বোরো মৌসুমের উৎপাদন ব্যয় নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা।
কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচে সীমাবদ্ধ নয়। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনেও এ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে দাম বাড়ায় উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপেই কৃষকের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ছয় কোটি টাকা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
এখন মাঠে রয়েছে আমন ধান। অনেক এলাকায় ধান কাটার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। কৃষকদের ভাষ্য, ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের ব্যয়ও বাড়বে।
নওগাঁ জেলার হোগলবাড়ী গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার বলেন, এবার আমন চাষে সব মিলিয়ে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সার ও সেচের খরচ বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আমনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরোতে কী হবে, সেটা ভাবতেই ভয় লাগে। বোরোতে সেচ লাগে অনেক বেশি। তাই এবার সেচ কম লাগে– এমন ফসল করার চিন্তা করছি।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক অজি উল্যাহ বলেন, আমনের তুলনায় বোরো ধানে সেচ অনেক বেশি লাগে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ও মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে অনেকে বোরো চাষ থেকে সরে যেতে পারেন।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষক সিদ্দিক মিয়া বলেন, এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। কৃষকের খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ধানের দাম বাড়ছে না। নিজের সম্পদ বিক্রি করে কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়।
বোরো মৌসুম নিয়ে শঙ্কা
দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। আর বোরো চাষে সেচের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন রয়েছে।
দেশে প্রায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই, ঝাড়াই ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে আগামী ডিসেম্বর থেকে বোরোর প্রস্তুতি শুরু হলে বাড়তি দামেই ডিজেল কিনতে হবে কৃষকদের।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ডিজেলচালিত সেচের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দাম বাড়লেও কৃষির জন্য ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়াও জরুরি।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব সবকিছুর ওপর পড়ে। কৃষকের বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে পরবর্তী মৌসুমে কৃষকের উৎপাদনে আগ্রহ কমতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন হলে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে অর্থ সাশ্রয় করে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো যেতে পারে।
অন্যদিকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকার কৃষকের পাশে আছে। সরকার বিনা মূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দিচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।