• হোম > আন্তর্জাতিক > ১ হাজার ৪০০ পরিবার উচ্ছেদের পর ধুবড়িতে আদানির ৩২০০ মেগাওয়াট প্রকল্প

১ হাজার ৪০০ পরিবার উচ্ছেদের পর ধুবড়িতে আদানির ৩২০০ মেগাওয়াট প্রকল্প

  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:১৮
  • ২৪

---

 

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের আসামের ধুবড়ি জেলার চাপরে একই জায়গায় এখন পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন ও উচ্ছেদের দুই ভিন্ন চিত্র। একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ঘর হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা জমিতেই রোববার আদানি পাওয়ারের ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

প্রকল্পটিতে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা রয়েছে। আদানি গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী, নির্মাণপর্বে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পটি চালু হলে আরও প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রথম ধাপে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ধুবড়ির চারুয়াবাখরা, চিরাকুটা এক ও দুই এবং সন্তোষপুর এলাকায় প্রায় ১ হাজার ১৫৭ একর সরকারি জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বহু পরিবার বসবাস করছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাদের অনেকেই সেখানে তিন থেকে চার দশক ধরে বসবাস করে আসছিলেন।

স্থানীয়দের একটি অংশ আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে ওই এলাকায় এসে ঘরবাড়ি তৈরি করেছিলেন। উচ্ছেদের পর প্রায় ১০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি প্রথমে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাকে দেওয়া হয়। পরে ওই জমি আদানি পাওয়ারের প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসন অন্য এলাকায় ৩০০ বিঘা জমি চিহ্নিত করে। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি ও মালপত্র সরিয়ে নিতে পরিবারপ্রতি ৫০ হাজার টাকা সহায়তার কথাও জানানো হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি অংশ ওই পুনর্বাসনস্থানে যেতে রাজি হয়নি।

তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত পুনর্বাসন এলাকা ব্রহ্মপুত্রঘেরা নিচু ভূমিতে অবস্থিত। বর্ষাকালে সেখানে পানি ঢুকে যায়। পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে সেখানে গিয়ে নতুন করে বসতি স্থাপন করলে তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে তারা মনে করেন।

প্রকল্পের জমি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদনে দেওয়া তথ্য ঘিরে। আদানি পাওয়ার কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে দেওয়া আবেদনে জানিয়েছিল, প্রকল্প এলাকায় কোনো জনবসতি নেই এবং পুনর্বাসন বা পুনর্বাসনজনিত ক্ষতিপূরণের কোনো দাবি নেই।

তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বক্তব্য এর সঙ্গে মেলে না। তাদের দাবি, প্রকল্পের জন্য ঘরবাড়ি সরিয়ে জমি পরিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার অভিযোগ, সরকারি জমির পাশাপাশি জমির অধিকারপত্র থাকা মানুষের জমিও নেওয়া হয়েছে এবং তাদের একটি বড় অংশ এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ জেলা প্রশাসন গ্রামের চারণভূমি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। এরপর ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের ভূমি-সংক্রান্ত বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও এ প্রস্তাবের উল্লেখ ছিল। পরে উচ্ছেদের নোটিশ জারি এবং ঘরবাড়ি ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে প্রকল্পটিকে আসামের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তার দাবি, ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র রাজ্যের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আদানি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হবে। বিপুল বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কারণে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে উন্নয়নের এই সম্ভাবনার পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও রয়ে গেছে। প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ধুবড়িতে তাই পুরোনো প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে—যে জমিতে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠছে, সেই জমির বিনিময়ে ঘর হারানো মানুষগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের হিসাব কীভাবে মেলানো হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17849 ,   Print Date & Time: Tuesday, 22 September 2026, 03:33:52 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh