• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মত কী

তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মত কী

  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৫
  • ১৩

---

ইবি রিপোর্ট

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম একবারে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। একসঙ্গে এতটা দাম বাড়ানোর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, বিপিসির লোকসান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনামূলক দামের বিষয় তুলে ধরেছে। তবে এসব যুক্তির কয়েকটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।

নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা হয়েছে। এর আগে গত জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়।

সরকারের ব্যাখ্যা

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

সরকারের হিসাবে, চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।

সরকার আরও বলছে, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম এখনো কম। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতে ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা। থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও দাবি করা হয়েছে, দেশের তুলনামূলক কম দামের কারণে প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইএমএফের চাপের দাবি

সরকারের ব্যাখ্যার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ঢাকা চেম্বার অ্যান্ড কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ। তাঁর দাবি, দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের দেওয়া কারণগুলো মূল বিষয় নয়। তাঁর মতে, এর সঙ্গে আইএমএফের চাপ এবং ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি জড়িত।

শামস মাহমুদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করে। বর্তমানে দাম কমার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিপিসির চুরি ও সিস্টেম লস কমানোর বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষির খরচ বাড়বে। এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়বে। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ও নিম্নবিত্ত পরিবার এতে চাপে পড়তে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থনীতির ওপর প্রভাব নিয়ে শঙ্কা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, জনস্বার্থে সরকারকে কিছু খাতে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য নতুন উৎস খোঁজা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সরাসরি তুলনা করার বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, প্রতিটি দেশের অর্থনীতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ড. বিদিশা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষিতে সেচ, সার ও উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে। শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার কারণে রপ্তানি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অকটেনের দাম নিয়েও প্রশ্ন

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অকটেনের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, দেশে অকটেন উৎপাদিত হয় এবং এক বছরের জন্য অতিরিক্ত মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বিপিসি নিয়মিতভাবে দেশের বাজারে দাম কমায় না। জ্বালানি খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি কমানো গেলে দাম বৃদ্ধির চাপ কমানো সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নাজের হোসাইনের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

‘সরকার নিরুপায় হয়ে দাম বাড়িয়েছে’

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার অনেকটা ‘নিরুপায়’ হয়েই দাম বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এর দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ও কৃষিতে পড়বে। তবে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার পর পরিবহন খাতে যেন আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি ভাড়া না বাড়ে, সেটি নজরে রাখা দরকার। একই সঙ্গে কৃষিসহ কিছু খাতে কম দামে জ্বালানি সরবরাহের জন্য রেশনিংয়ের কথা ভাবতে পারে সরকার।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের পক্ষেও মত দেন তিনি। তাঁর মতে, হঠাৎ করে দাম বাড়ালে এর অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বেশি হয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17836 ,   Print Date & Time: Tuesday, 22 September 2026, 06:27:50 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh