
ইবি রিপোর্ট
‘আমার একটাই ছেলে ছিল। কুমিল্লার আবহাওয়ায়, কুমিল্লার আকাশের নিচে, আপনাদের ভালোবাসায়, আপনাদের স্নেহে ও বড় হয়েছিল। ওর বয়স ১৩ বছর।’
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের প্রথম জানাজার আগে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
এ সময় শত শত মানুষের সামনে স্ট্রেচারে শায়িত ছিল ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের নিথর দেহ। তার প্রথম জানাজায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
প্রথম জানাজা শেষে অপ্রতিমের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে। সেখানে বেলা ১১টার দিকে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অপ্রতিমের সহপাঠী, শিক্ষক, স্বজন এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতি এলাকার স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
প্রথম জানাজা শেষে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ছেলে হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার দাবি করেন কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই। বর্তমান বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। এই আস্থাটা যেন ব্রেক না হয়। আমার বিশ্বাস, ব্রেক হবে না এবং সুষ্ঠু বিচার হবে।’
ছেলেকে হারানোর শোকের মধ্যেও তিনি বিচার ব্যবস্থার প্রতি নিজের আস্থার কথা জানান এবং অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।
কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজার সময়ও ছেলেকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন অপ্রতিমের বাবা।
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের বয়স যখন দুই বছর, তখন সে এই এলাকায় এসেছে। আমার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অপ্রতিম আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে। আপনাদের আদর-স্নেহ পেয়েছে, আপনাদের বাসায় খেয়েছে। তাই আপনাদের কাছেই অপ্রতিমকে সমাহিত করছি।’
এ সময় সন্তান হারানোর বেদনা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি।’
বাবার এমন কথায় জানাজায় উপস্থিত মানুষের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়।
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কোটবাড়ির বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজের বিষয়টি জানানো হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
নিখোঁজের প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এরপর অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় কয়েকজন তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
১৩ বছরের অপ্রতিমকে হারিয়ে তার পরিবার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সন্তানের শেষ বিদায়ে বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারের কণ্ঠে ছিল একদিকে শোক, অন্যদিকে ছেলে হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।