• হোম > মতামত > একটি আইফোন, একটি প্রাণ এবং আমাদের সমাজের দায়

একটি আইফোন, একটি প্রাণ এবং আমাদের সমাজের দায়

  • শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১০
  • ৪৩

---

আহমেদ তোফায়েল

একটি কিশোর ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। তার বয়স মাত্র ১৩ বছর। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু আর ফেরা হয়নি। এক দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের পাহাড়ি এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছে তার মরদেহ। সঙ্গে থাকা আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের এই মৃত্যু আমাদের সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্নও রেখে গেছে। কেন একটি কিশোরকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হলো? ফোনটি কি সত্যিই হত্যার কারণ? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ঘটনা? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের কোনোটি নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে ইশায়াত মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ফোনটির অবস্থান কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে শনাক্ত করা যায়। এরপর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এই তথ্যগুলো তদন্তের জন্য নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু এগুলো থেকে হত্যার কারণ নিশ্চিত করা যায় না। পুলিশও বলছে, হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে এবং কীভাবে কিশোরটির মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের পরই জানা যাবে।

অর্থাৎ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—তথ্যকে তথ্য হিসেবেই দেখা। একটি ফোন পাওয়া যায়নি, তাই ফোনের জন্যই হত্যা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে ফোনটি নিখোঁজ থাকার বিষয়টিকেও তদন্তের বাইরে রাখা যায় না।

এই ভারসাম্যটাই এখন জরুরি। কারণ একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অনুমান দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা তদন্তকে যেমন বিভ্রান্ত করতে পারে, তেমনি পরিবারের জন্যও নতুন কষ্ট তৈরি করতে পারে।

স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। এর মধ্যে থাকে ব্যক্তিগত ছবি, পরিচয়, যোগাযোগের তথ্য, অবস্থান, ব্যাংকিংসহ নানা ধরনের তথ্য। আবার দামি ফোন নিজেই অনেকের কাছে মূল্যবান সম্পদ।

শিশু-কিশোরদের হাতে এমন যন্ত্র পৌঁছে গেছে খুব সহজেই। কিন্তু তাদের অনেকেই জানে না, রাস্তায় ফোন ব্যবহার করার সময় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোথায় ফোন বের করা নিরাপদ, অপরিচিত কেউ ফোন চাইলে কী করতে হবে, বিপদের সময় কীভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এসব বিষয় নিয়ে পরিবারে নিয়মিত আলোচনা খুব বেশি হয় না।

সমস্যা হলো, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা নিয়ে কথা বলি; ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তুলনামূলক কম কথা বলি।

অভিভাবকেরাও অনেক সময় ধরে নেন, সন্তান পরিচিত এলাকায় আছে বলেই নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে পরিচিত এলাকা, পরিচিত রাস্তা বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন স্থানও সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে।

ইশায়াত নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টাও হয়েছে। তারপরও তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনা নিখোঁজ শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।

কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো। পাশাপাশি ফোনের অবস্থান, শেষ যোগাযোগ, সম্ভাব্য চলাচলের পথ, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব তথ্য দ্রুত সংরক্ষণ করা দরকার। প্রযুক্তিগত তথ্য যত দ্রুত পাওয়া যায়, তত দ্রুত অনুসন্ধানের পরিধি নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।

অভিভাবকের জন্য শিক্ষা কোথায়

এই ঘটনার পর অনেক অভিভাবক হয়তো সন্তানকে দামি ফোন দেওয়া নিয়ে নতুন করে ভাববেন। কিন্তু সমাধান শুধু ফোন না দেওয়ার মধ্যে নেই। বরং সন্তানকে শেখাতে হবে ফোন কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করতে হয়। কোথায় নিজের অবস্থান প্রকাশ করা ঠিক নয়, অপরিচিত কারও সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, বিপদে পড়লে কাকে ফোন করতে হবে, ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে—এসব বিষয়ে বয়স উপযোগী শিক্ষা দরকার।

আরেকটি বিষয় হলো, শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। সে যেন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখলে দ্রুত মা-বাবাকে জানাতে পারে। পরিবারের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা দরকার, যাতে সন্তান কোনো বিপদ বা ভুলের কথা বলতে ভয় না পায়।

স্মার্টফোনে অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি থাকা আর সেটি সংকটের মুহূর্তে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। নিখোঁজ ব্যক্তি, বিশেষ করে শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে মোবাইলের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনি বিধানও মানতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকা দরকার। নিরাপত্তা মানে শুধু ক্যাম্পাসের ফটকে পাহারা নয়; একজন শিক্ষার্থী বাইরে যাওয়ার পর বিপদে পড়লে কীভাবে দ্রুত সহায়তা পাবে, সেটিও নিরাপত্তার অংশ।

ইশায়াতের মৃত্যুর পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। তাঁর একমাত্র সন্তানকে হারানো পরিবারের জন্য এই ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন শিক্ষক লিখেছেন, একটি ফোনের বদলে আরও অনেক ফোন মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া যেত। কথাটির মধ্যে সন্তানের জীবনের অমূল্যতার যে বোধ রয়েছে, সেটিই এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক।

একটি ফোনের মূল্য যতই হোক, মানুষের জীবনের সঙ্গে তার কোনো তুলনা চলে না। কিন্তু অপরাধের কারণ যদি সত্যিই কোনো মূল্যবান প্রযুক্তিপণ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি নতুন দুর্বলতার কথাও বলে।

তদন্তে যদি অন্য কোনো কারণ উঠে আসে, তাহলেও শিক্ষা কম হবে না। কারণ একটি শিশু নিখোঁজ হয়েছে, তার অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি।

এখন প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। কী ঘটেছিল, কোথায় ঘটেছিল, কারা জড়িত ছিল এবং নিখোঁজ হওয়ার পর কোন পর্যায়ে কী ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ চলাচল, স্মার্টফোন ব্যবহারের ঝুঁকি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

অপ্রতীমকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজকে আরও সতর্ক করে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আরেকটি পরিবারকে একই শোকের মধ্য দিয়ে যেতে হবে না।

লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।

সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও  দৈনিক ইত্তেফাক


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17707 ,   Print Date & Time: Sunday, 20 September 2026, 10:06:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh