
মো. আখতারুজ্জামান
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। নদী, মোহনা ও সাগর—প্রকৃতিই এই মাছের সবচেয়ে বড় উৎপাদনভূমি। অথচ ইলিশের মৌসুম এলেই বাজারে যে চিত্র দেখা যায়, তাতে মনে হয় এটি যেন বিদেশ থেকে আমদানি করা কোনো দুর্লভ পণ্য। কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা বা তারও বেশি দামে ইলিশ বিক্রি হওয়া এখন আর অস্বাভাবিক খবর নয়। প্রশ্ন হলো, যে মাছ দেশের নদী ও সাগরে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, তার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় কেন?
প্রশ্নটি শুধু একটি মাছের দাম নিয়ে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বাজারব্যবস্থা, জেলেদের আয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা, রপ্তানি নীতি, আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ। ফলে ইলিশের বাজারকে শুধু মাছের বাজার হিসেবে দেখলে সমস্যার বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়।
উৎপাদন বেশি, দামও বেশি—এই বৈপরীত্য কেন:
বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের বড় অংশই বাংলাদেশে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। পরের দুই অর্থবছরে উৎপাদন কমে যথাক্রমে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ও ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন কমার বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। নদীদূষণ, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার এবং ডিমওয়ালা ইলিশ ও জাটকা আহরণের মতো বিষয়গুলো এর সঙ্গে যুক্ত। সাগরে প্রতিকূল আবহাওয়াও মাছ ধরার ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে উৎপাদন কমে যাওয়াই ইলিশের বর্তমান উচ্চমূল্যের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। কারণ মাছটি জেলের নৌকা থেকে ভোক্তার রান্নাঘরে পৌঁছানোর আগেই কয়েক দফা হাতবদল হয়। এই সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে পরিবহন, বরফ, সংরক্ষণ, শ্রম ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়। কিন্তু একই সঙ্গে যোগ হয় মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা। এখানেই মূল প্রশ্ন: ইলিশের খুচরা মূল্যের যে অংশটি বাড়ছে, তার কতটা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের কারণে আর কতটা বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে?
জেলে কম পান, ভোক্তা বেশি দেন:
ইলিশের বাজারে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। যে জেলে নদী বা সাগরে ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরছেন, তিনি সব সময় মাছের খুচরা দামের সমানুপাতিক আয় পান না। দাদন ব্যবস্থা, আড়তদারের ওপর নির্ভরতা এবং আগাম ঋণের কারণে অনেক জেলে স্বাধীনভাবে মাছের দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। অন্যদিকে মাছটি যখন শহরের বাজারে পৌঁছায়, তখন তার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই প্রান্তেই চাপ থাকে, মাঝের স্তরগুলোতে তৈরি হয় অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ।
এ অবস্থায় শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। কারণ বাজারের কাঠামো না বদলালে একজন ব্যবসায়ীকে সরিয়ে অন্য একজন ব্যবসায়ী একই জায়গা দখল করতে পারেন।
জেলেদের সমবায়ভিত্তিক বিপণন, সরাসরি বাজারজাতকরণ এবং ডিজিটালভাবে দর প্রকাশের ব্যবস্থা করা গেলে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব। মাছ কোথায় কত দামে কেনা হয়েছে এবং কোন পর্যায়ে কত খরচ যুক্ত হয়েছে—এই তথ্য প্রকাশ্য থাকলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগও কমবে।
ডলার সংকটে ইলিশ আমদানির প্রশ্ন:
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা একটি বড় বিষয়। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন—সবকিছুর জন্যই ডলার দরকার। এমন সময়ে কোন পণ্য আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করা হবে, সেটি নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে নীতিগত অগ্রাধিকারের প্রশ্নও যুক্ত।
এই জায়গায় ইলিশ আমদানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দেশে যে মাছের উৎপাদন রয়েছে, সেই মাছই বিদেশ থেকে আনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করার অর্থনৈতিক যুক্তি কতটা শক্ত—এটি পর্যালোচনা করা দরকার।
অবশ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বলতে পারেন, বিদেশি ইলিশের চাহিদা আছে এবং আমদানি হলে বাজারে সরবরাহ বাড়ে। প্রতিযোগিতা বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনাও থাকে। এই যুক্তি অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে অগ্রাহ্য করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে আমদানি করা মাছ যদি কম দামে এনে দেশীয় ইলিশের সমান দামে বিক্রি করা হয়, তাহলে তার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। তাই আমদানি বন্ধ বা চালুর প্রশ্নের পাশাপাশি আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—আমদানির সুবিধা শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন?
রপ্তানির প্রভাবও দেখতে হবে:
ইলিশ নিয়ে বাংলাদেশের আরেকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো রপ্তানি। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত বছর উৎসবের মৌসুমের আগে ভারতকে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। মাছ ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সময়ে গত দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে এবং সামনে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন আসতে পারে।
এখানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। একদিকে বাংলাদেশের ভালো মানের ইলিশ বিদেশে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে ইলিশ আমদানিও হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে এই বাণিজ্যকে লাভ-ক্ষতির পূর্ণ হিসাবের আলোকে দেখা দরকার।
রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে—এটি সত্য। কিন্তু দেশের বাজারে এর প্রভাব কী হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। রপ্তানির খবর বাজারে যাওয়ার পর যদি স্থানীয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তার চাপ পড়ে দেশের ভোক্তার ওপর। সুতরাং রপ্তানি নীতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহ ও দামকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ইলিশ সংরক্ষণও অর্থনীতির অংশ:
ইলিশের দাম কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। নদী ও মোহনা দূষিত হলে, ইলিশের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমতে পারে।
তখন সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারদর বাড়ার চাপ তৈরি হবে। অর্থাৎ নদী রক্ষা, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ করা শুধু পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যতের খাদ্য অর্থনীতিরও অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদকে এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে আজকের বাজারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে আগামী দিনের উৎপাদন নষ্ট না হয়।
দরকার বাজারের পূর্ণ চিত্র:
ইলিশের বাজারে সরকারের নীতি হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর। কত মাছ উৎপাদিত হলো, কত মাছ দেশের বাজারে থাকল, কত রপ্তানি হলো, কত আমদানি হলো, জেলে কত পেলেন, আড়তে কত দামে বিক্রি হলো এবং খুচরা বাজারে কত দামে পৌঁছাল—এই পুরো শৃঙ্খলের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি অস্বাভাবিক মজুত, কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করে মাছ বিক্রির অভিযোগ থাকলে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। শুধু মৌসুমে অভিযান চালিয়ে আবার বাজারকে আগের অবস্থায় ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
ইলিশকে ঘিরে নীতিতে আরেকটি ভারসাম্য দরকার। একদিকে রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অন্যদিকে দেশের ভোক্তার জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ—দুটিকেই বিবেচনায় রাখতে হবে। একইভাবে আমদানির ক্ষেত্রেও দেখতে হবে, তা সত্যিই বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে কি না, নাকি কেবল কিছু ব্যবসায়ীর জন্য নতুন মুনাফার ক্ষেত্র তৈরি করছে।
পরিশেষে, ইলিশ বাংলাদেশের শুধু একটি মাছ নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদও। এর সঙ্গে জেলে, আড়তদার, পরিবহন ব্যবসায়ী, বরফকল, খুচরা বিক্রেতা, রপ্তানিকারক এবং ভোক্তার স্বার্থ জড়িত। তাই ইলিশের দাম বাড়লেই শুধু ব্যবসায়ীকে দায়ী করা কিংবা আমদানি বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার সংস্কার। জেলেকে ন্যায্যমূল্য দিতে হবে, মধ্যস্বত্বভোগীর অস্বচ্ছতা কমাতে হবে, নদী ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করতে হবে এবং রপ্তানি-আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ বাজার—দুই দিক বিবেচনা করে। জাতীয় মাছ ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবে, আর একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে ইলিশের বাণিজ্য চলবে—এই বৈপরীত্য দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না। ইলিশের অর্থনীতি তাই শুধু মাছের দাম কমানোর প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায্য বাজার, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
লেখক: সাংবাদিক