
ইবি রিপোর্ট
তাঁতের সুতোর বুননের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, শিল্প ও জীবনসংগ্রামের নানা গল্প জড়িয়ে রয়েছে। শতবর্ষী ঐতিহ্যের অংশ টাঙ্গাইলের শাড়ি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি ও সমাদর পেয়েছে। এই ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী বিশেষ উৎসব ও মেলা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘ঐতিহ্য, সম্প্রীতি, হস্তশিল্প: টাঙ্গাইল তাঁতের উত্তরাধিকার উদযাপন’ শীর্ষক এই বিশেষ সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধন করা হয়।
বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ), বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করেছে।
সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সাবরীনা মনীর চিঠি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব, এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আলিফ রুদাবা এবং বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান (গ্রেড-২) মো. জাকির হোসেন। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান মিজ সুজান ভাইস।
আয়োজকদের মতে, এ উৎসব কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা যে ঐতিহ্য, দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেছেন, তার প্রতি সম্মান জানানোর একটি উদ্যোগ। তাঁতিদের শ্রম ও শৈল্পিক নৈপুণ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে দুপুর ১টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে বিশেষ আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে গ্যালারি সংলগ্ন লবিতে শুরু হয় তাঁতের শাড়ির মেলা।
মেলায় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি তাঁতশিল্পের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নানা অনুষঙ্গের নমুনা এবং সংশ্লিষ্ট গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য ও এর সঙ্গে জড়িত জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি বুননশিল্প ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট’ বা মানবজাতির বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধির তালিকায় স্থান করে নেয়। এর আগে ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ অর্জন করে। এসব স্বীকৃতির পর টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্য যথাযথভাবে উদযাপন ও বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ হিসেবে এবারের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, এর বিশ্বব্যাপী প্রসার ঘটানো এবং তাঁতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
উদ্বোধনী আলোচনা পর্বে বক্তারা টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং জিআই স্বীকৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করলেই ঐতিহ্য সংরক্ষণ সম্ভব নয়। নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে তাঁতিদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য দেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁতিদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়বে। একই সঙ্গে টাঙ্গাইলের সমৃদ্ধ হস্তশিল্প সংরক্ষণ, এর বাণিজ্যিক বিকাশ এবং একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সৃজনশীল শিল্প হিসেবে এর ভবিষ্যৎ পথচলাও আরও সুগম হবে।
চার দিনব্যাপী এ উৎসব ও মেলা প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর এ আয়োজনের সমাপ্তি হবে।