
ইবি রিপোর্ট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সময়ে এআই প্রযুক্তিকে কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে এবং এর ওপর কতটা সরকারি ও আইনগত নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত—এ প্রশ্নে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে মতভেদও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, এআই প্রযুক্তিকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর ওপর মানুষের আস্থা রাখা উচিত। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে এআই নিয়ে মানুষের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
স্যান ফ্রান্সিসকোতে এক সম্মেলনে অল্টম্যান বলেন, বিশ্ববাসীর তাদের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে তারা সঠিক কাজটি করবেন। কারণ এআই প্রযুক্তির গুরুত্ব তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে মানুষের উদ্বেগকে যৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন অল্টম্যান। তাঁর মতে, এআই কোন দিকে ভুলভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করার জন্য এখন আর খুব বেশি কল্পনার প্রয়োজন হয় না।
তবে এআই কোম্পানিগুলো নিজেরাই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর তুলনায় নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনে প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারে।
অল্টম্যানের এ অবস্থান অবশ্য প্রযুক্তি খাতের সবার সমর্থন পাচ্ছে না।
সমালোচকদের একটি অংশের বক্তব্য, এআই কোম্পানিগুলোর ওপর শুধু স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় আরও কঠোর সরকারি ও আইনগত তদারকির প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অল্টম্যান অ্যাক্সিওসকে বলেন, ২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি আশা করেছিলেন, উন্নত এআইয়ের জন্য আইনপ্রণেতারা একটি মৌলিক কাঠামো তৈরি করবেন। তবে এখনো সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এআইকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে উদ্ভাবনের গতি ধীর না করার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা আইনপ্রণেতাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর কাজে ফিরলেও এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কোনো আইন দ্রুত পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কীভাবে এআইয়ের জন্য প্রবিধান তৈরি করা হবে, তা নিয়েও মার্কিন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের অভাব রয়েছে।
এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবির শুরু থেকেই সমালোচনা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের ভয়কে ‘ধাপ্পাবাজি’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ‘গার্ডরেল’ হলো একজন শক্তিশালী ও বিচক্ষণ প্রেসিডেন্ট।
ফলে এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে একদিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের দাবি থাকলেও অন্যদিকে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতাও রয়েছে।
অল্টম্যানের মন্তব্যের পর মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এআই কোম্পানিগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতার কথা তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই নিরাপত্তা ও ‘এলাইনমেন্ট’ নিয়ে কাজ না করা কোনো ল্যাব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি কোনো এআই মডেলের কারণে ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বড় ধরনের আইনি দায়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোম্পানিগুলোর নিজস্ব প্রণোদনাও রয়েছে।
স্যান ফ্রান্সিসকোর ওই সম্মেলনে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও এআই কোম্পানির নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের পক্ষে মত দেন।
তাঁর মতে, নতুন কোনো এআই সংস্করণ বাজারে বা ব্যবহারকারীদের জন্য চালু করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত কোম্পানিগুলোর নিজেদের নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাইরে থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন।
হুয়াংয়ের ভাষ্য, এআই খাতের জন্য নতুন আইন বা প্রবিধানের প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, এআইয়ের নিরাপত্তা মূলত একটি প্রকৌশলগত সমস্যা। কোনো পণ্যের ওপর আস্থা নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজেরই উচিত প্রয়োজনে সেটির কার্যক্রমে বিরতি দেওয়া।
তবে এআই খাতের স্বনিয়ন্ত্রণের ধারণার সমালোচনা করেছেন রাজনীতিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ।
মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং সাবেক হোয়াইট হাউসের কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন মনে করেন, এআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিতসংখ্যক ধনী ব্যক্তি বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্কও এআইকে পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত শিল্প হিসেবে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
‘লজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’-এর চিফ অপারেটিং অফিসার প্যাট্রিক হিলম্যানও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো কোম্পানি যদি নিজেদের তৈরি প্রযুক্তিকে সত্যিই বিপজ্জনক মনে করে, তাহলে কোন কোন কাজ বন্ধ করতে তারা প্রস্তুত—সেটি স্পষ্টভাবে দেখানো প্রয়োজন।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে অ্যানথ্রোপিকের এক গবেষকের পদত্যাগ এবং তাঁর একটি ভাইরাল পোস্টের পর।
ওই গবেষক দাবি করেছিলেন, এআই অনিয়ন্ত্রিত থাকলে চলতি দশকের শেষ নাগাদ এটি ‘সব মানুষকে মেরে ফেলতে পারে’। কয়েকজন এআই নির্বাহী ও বিশেষজ্ঞ ওই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও কীভাবে তারা এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বা এআই ঠিক কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই অল্টম্যানের বক্তব্যকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আধুনিক এআইয়ের অগ্রদূত ও গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, এআইয়ের সম্ভাব্য মারাত্মক ঝুঁকি এড়াতে শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক শিল্পের ওপর নির্ভর না করে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রযুক্তি নির্বাহীদের অবস্থান সবসময় একই ছিল না। এর আগে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই এআই শিল্পের গতি কমিয়ে আনা এবং সরকারকে এই খাতের তদারকি করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সে সময় ওপেনএআইয়ের অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং ইলন মাস্কও এ ধরনের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
তবে পরবর্তী সময়ে অল্টম্যানসহ কয়েকজন প্রযুক্তি নির্বাহী এআই নিরাপত্তায় কোম্পানিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও শিল্পের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছামূলক নিরাপত্তা উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের শীর্ষ নির্বাহীরা জানিয়েছেন, তারা একটি শিল্পভিত্তিক নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে কাজ করছেন। নিরাপত্তার মানদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য অন্যান্য এআই কোম্পানির সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন আমোদেই।
ওপেনএআইয়ের নির্বাহী ক্রিস লেহান বলেছেন, সরকারি সহায়তা থাকুক বা না থাকুক, শীর্ষ এআই ল্যাবগুলো স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপত্তার মান উন্নত করার চেষ্টা করছে।
ফলে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা বা উদ্ভাবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নিরাপত্তা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ, কোম্পানির স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনি দায় এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রশ্ন। এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহী, রাজনীতিক ও গবেষকদের অবস্থানের পার্থক্যই সামনের দিনগুলোতে এআই নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।