• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫,০৭৭টি, আমানত ১৬ হাজার কোটি

কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫,০৭৭টি, আমানত ১৬ হাজার কোটি

  • বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:১৫
  • ৯

---

ইবি রিপোর্ট

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মধ্যেও ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে এমন ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮.৭৫ লাখ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাস আগে এই পরিমাণ ছিল ৮.৫৯ লাখ কোটি টাকা।

ব্যাংকারদের ধারণা, কোটি টাকার এসব ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির। বাকি হিসাবগুলোর বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক। তাই কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তাদের মতে, ব্যাংক আমানত সাধারণত প্রতিবছর বাড়ে। কোনো সময়ে এর প্রবৃদ্ধি বেশি থাকে, আবার কখনো কমে যায়। ফলে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যাতেও পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক।

ব্যাংকাররা আরও জানান, সামগ্রিক ব্যাংক আমানতের তুলনায় কোটি টাকার হিসাবগুলোর আমানত বৃদ্ধির হার কম। জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। বিপরীতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোর আমানত বেড়েছে ৮.২৯ শতাংশ। এর আগের বছর এ শ্রেণির আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ৪.৫২ শতাংশ।

তাদের মতে, দেশের অর্থনীতির আকার এবং ধনিক শ্রেণির তুলনায় ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা খুবই কম। ফলে এসব হিসাবের তথ্য দিয়ে দেশের মোট সম্পদের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। ধনী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ব্যাংকের পরিবর্তে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য খাতে অর্থ বিনিয়োগ করেন।

এ ছাড়া ধনিক শ্রেণির একটি অংশ উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনা এবং বিলাসী জীবনযাপনের প্রবণতার কথাও বলা হয়।

ব্যাংকাররা মনে করেন, অতিরিক্ত ভ্যাট-কর ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ধনী ব্যক্তি ব্যাংক এড়িয়ে চলেন। কেউ ব্যাংকে অর্থ রাখলেও তা একাধিক হিসাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে রাখেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যাংক খাতের সংকটও ধনিক শ্রেণির একটি অংশকে ব্যাংকবিমুখ করছে বলে তাদের ধারণা।

মেঘনা ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকে অতিধনীদের জমা অর্থের পরিমাণ খুবই কম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার। একইসঙ্গে দেশে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও প্রকট। ‘কিন্তু ব্যাংক হিসাবের তথ্য সেই বৈষম্যের প্রতিফলন ঘটায় না।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এত বড় জনসংখ্যার একটি দেশে ব্যক্তিশ্রেণির মাত্র ১২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘এর অর্থ হতে পারে, অতিধনীরা ব্যাংকে অর্থ রাখছেন না অথবা একই ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থ রাখতে স্বস্তি বোধ করছেন না,’ বলেন তিনি।

কোটি টাকার আমানতে ওঠানামা

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮.৩৪ লাখ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের জুন শেষে এমন হিসাব ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮.৮ লাখ কোটি টাকা।

এতে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা এবং এসব হিসাবে জমা অর্থ—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এই উপাত্ত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোটি টাকার হিসাবগুলোর ধরন বোঝা জরুরি। ‘ফলে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই।’

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিশ্রেণির কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়লে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখার কারণ নেই।

‘তবে একজন ব্যক্তির বৈধ আয়, বেতন-ভাতা, ব্যবসার আয় ও মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় কত সময়ে কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে কারও ব্যাংক হিসাবে দ্রুত অর্থ বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে,’ বলেন তিনি।

আরিফ হোসেন আরও বলেন, কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়ার আরেকটি দিকও রয়েছে। আরও বেশি মানুষ কোটিপতি হওয়া সম্পদের বণ্টন আরও অসম হওয়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে।

‘কারণ অল্প কিছু মানুষের হাতে অতিরিক্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাটের বিষয়টি অনেককে নিরুৎসাহিত করে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, কর ফাঁকির উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা করেন। আবার আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় বৈধ অর্থও ব্যাংকে রাখতে অনেকে ভয় পান।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে থাকা এই ভয় ও অনাস্থার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। ‘একইসঙ্গে আইনের অপপ্রয়োগ যাতে মানুষের জন্য হয়রানি বা বিপদের কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17545 ,   Print Date & Time: Thursday, 17 September 2026, 12:08:29 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh