
ইবি রিপোর্ট
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠাতে পারছেন না দেশের অধিকাংশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক। এতে একদিকে শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের ছাড় দিতে হচ্ছে এবং নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) জরিপে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকট এবং পরবর্তীতে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবে ৮৭ শতাংশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক সময়মতো শিপমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিলম্বের কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানিকারক বিদেশি ক্রেতাদের ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিকেএমইএর ৮০০টি সক্রিয় রপ্তানিমুখী সদস্য কারখানার মধ্যে ১৩৪টি কারখানা থেকে তথ্য নিয়ে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। ২০২৬ সালের ২১ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা গ্যাস সংকটে এবং ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ সময়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৮ শতাংশ কম ছিল।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে প্রায় সব উত্তরদাতাই সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে শিপমেন্টে বিলম্ব, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আস্থার অভাবসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় আমরা প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের রপ্তানি পণ্য বিমানে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি। এতে আমাদের বিপুল লোকসান হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আরেকটি পণ্যের চালান সময়মতো পাঠাতে পারিনি। রপ্তানি আদেশটি বাতিল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। আদেশ বাতিল এড়াতে এখন আমাদের ইইউয়ের ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। এছাড়া কারখানার কার্যক্রম চালু রাখতে আমাদের বাড়তি খরচ করে ডিজেল কিনতে হয়েছে।’
এহসান বলেন, ‘কাঁচামালের অভাবে কাজ না থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে শ্রমিকদের প্রায় ১৪ দিনের মজুরি দিতে হয়েছে।’
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও রপ্তানি আদেশ হারিয়েছেন। তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘প্রত্যাশিত ৬২ লাখ পিস টি-শার্টের অর্ডারের বিপরীতে আমরা ৪০ লাখ পিসের অর্ডার পেয়েছি, যা প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। চলমান জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ক্রেতারা বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে ব্যবসায় আস্থা হারাচ্ছেন; ফলে পূর্ণাঙ্গ আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।’
জরিপে আরও দেখা যায়, প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানির জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে। তিন-চতুর্থাংশের বেশি কারখানায় আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং ৭ শতাংশ মালিক পুরোপুরি কারখানা বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছেন। প্রায় ৮৯ শতাংশ মালিক বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। প্রতি ১০ রপ্তানিকারকের মধ্যে ৬ জন ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ার কথা বলেছেন।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘এই জরিপে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই সাময়িক জ্বালানি সংকটে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।
‘এই জরিপ থেকে আরও প্রমাণিত যে, সরকারের নীতিগত সহায়তা পাওয়া গেলে, এই সাময়িক সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।’
কক্সবাজারে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বিকল হয়ে পড়ার পর ২১ জুলাই থেকে দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়। প্রতিবেদন লেখার সময়ও প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে সংকট অব্যাহত ছিল। চট্টগ্রামে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সিলেট ও ভোলার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দিনে সাত থেকে নয় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া যায়।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করে জানান, ওইদিন রাত থেকেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে পোশাক খাতের মালিকরা রপ্তানি আদেশ কমার কথা বললেও ঢাকায় থাকা অন্তত চারটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা টিবিএসকে জানিয়েছেন, তাদের পণ্যের ক্রয়াদেশ স্বাভাবিক রয়েছে। একজন ক্রেতা প্রতিনিধি জানান, তারা সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়িয়েছেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানি পরিস্থিতির চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল।