• হোম > বাণিজ্য > সর্বজনীন পেনশনে ৫৫ বছরেই পেনশন, পাঁচ বছর পর টাকা তোলার প্রস্তাব

সর্বজনীন পেনশনে ৫৫ বছরেই পেনশন, পাঁচ বছর পর টাকা তোলার প্রস্তাব

  • বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০
  • ২৩

---

 

ইবি রিপোর্ট

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় ও গ্রাহকবান্ধব করতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তে কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার সুযোগ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়া এবং বর্তমান ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকেই পেনশন চালুর উদ্যোগ।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। এটি কর্তৃপক্ষের চতুর্থ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক। সভায় মোট ১১টি আলোচ্যসূচি রাখা হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরিচালনা পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে দেশে সর্বজনীন পেনশনের চারটি কর্মসূচি চালু রয়েছে। এগুলো হলো—প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মজীবী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ এবং প্রবাসীদের পেনশন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে।

দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করা হয়। তবে চালুর তিন বছর পার হলেও এ কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চারটি কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন গ্রাহক নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের জমা করা মোট আমানতের পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সমতা কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এ কর্মসূচিতে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

প্রবাসীদের জন্য চালু করা প্রবাস কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী এতে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী রয়েছেন ৯৭ জন। এই কর্মসূচিতে নিবন্ধিত প্রবাসীদের মোট জমার পরিমাণ ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

গ্রাহকদের মতে, সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে মানুষের আগ্রহ কম থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন কম হওয়া এবং পেনশন পাওয়ার আগে গ্রাহকদের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধা সীমিত থাকার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর তা থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ নিয়মিত চাঁদা দিতে না পারলে জমা দেওয়া অর্থ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বেরিয়ে আসার সুযোগও নেই।

এই নিয়ম পরিবর্তনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন গ্রাহকদের অনেকে। এবার পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় তাঁর জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

এই পরিবর্তন অনুমোদিত হলে জরুরি আর্থিক পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের জন্য সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার একটি সীমিত সুযোগ তৈরি হবে।

পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চাঁদাদাতা আজীবন অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পেনশন পান। তিনি মারা গেলে পরিবারের অন্য কেউ নিয়মিত পেনশন পান না।

তবে চাঁদাদাতা ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর নমিনি ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত যে সময় বাকি থাকে, শুধু সেই সময়ের জন্য পেনশন পাওয়ার সুযোগ পান।

নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রী আজীবন পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে পেনশন পাওয়ার নিয়ম রয়েছে। এবার পেনশন শুরুর বয়স কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দ্বিতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভায় পেনশন স্কিমে থাকা চাঁদাদাতাদের ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে জমা করা অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে এককালীন অর্থ উত্তোলনের এমন সুযোগ ছিল না।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ইসলামি ভার্সন চালুর বিষয়টিও আগামীকালের বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনতে ইসলামি পেনশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এ বিষয়ে পর্ষদের সভায় প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।

একই সঙ্গে গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে গ্রাহক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মুঠোফোন আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ (এমএফএস) অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।

বর্তমানে গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৫ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই কমিশন বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকে। কমিশন বাড়ানো হলে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম আরও উৎসাহিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি এবং মুনাফার হার পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় রিজার্ভ বা কনটিনজেন্সি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের মতে, পেনশন তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের তহবিল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের মুনাফার হারে পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে যে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা মোকাবিলায় এই তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবগুলো পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কার্যক্রম চালু করা হবে।

যেভাবে সর্বজনীন পেনশনে নিবন্ধন

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে ইউপেনশন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়।

নিবন্ধন প্রক্রিয়ার শুরুতে আবেদনকারীকে একটি প্রত্যয়ন দিতে হয়। সেখানে উল্লেখ থাকে যে তিনি সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নন এবং সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির বাইরে কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণ করছেন না। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো ধরনের ভাতা গ্রহণ করছেন না—এ মর্মেও প্রত্যয়ন দিতে হয়।

এরপর ‘আমি সম্মত আছি’ অংশে ক্লিক করলে পরবর্তী ধাপে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেখানে আবেদনকারীকে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা অথবা প্রগতি—এই চার কর্মসূচির মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।

এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর, জন্মতারিখ, মুঠোফোন নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানা দিতে হয়। ফরমে ক্যাপচা পূরণ করে পরবর্তী ধাপে গেলে আবেদনকারীর মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইলে একটি ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর পাঠানো হয়।

ওটিপি নির্ধারিত স্থানে দেওয়ার পর পরবর্তী ধাপের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির নতুন প্রস্তাবগুলো আগামীকালের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে অনুমোদিত হলে পরবর্তী সময়ে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে পেনশন শুরুর বয়স, নমিনি সুবিধা, জরুরি প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলন, ইসলামি পেনশন ও স্বাস্থ্যবিমার মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আসার সুযোগ তৈরি হবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17480 ,   Print Date & Time: Thursday, 17 September 2026, 10:44:13 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh