• হোম > বাণিজ্য | বিশ্ব সংবাদ | বিশ্ববাণিজ্য > তিন বছরের বেশি সময় পর সুদের হার বাড়াল ফেড, আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত

তিন বছরের বেশি সময় পর সুদের হার বাড়াল ফেড, আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত

  • বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪
  • ৩৩

---

 

ইবি রিপোর্ট

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিন বছরের বেশি সময় পর নীতি সুদের হার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেডারেল রিজার্ভ)। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নীতি সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফেডের ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি (এফওএমসি) ১২-০ ভোটে এই সিদ্ধান্ত নেয়। ফেড জানিয়েছে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থিতিশীল গতিতে বাড়ছে, কর্মসংস্থানও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উঁচু পর্যায়ে থাকায় তা ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় ফিরিয়ে আনতে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করার প্রয়োজন হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তিনি ফেডের কাছে দ্রুত সুদ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ফেডের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সেই দাবির বিপরীতমুখী নীতি নেওয়া হয়েছে।

ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, মূল্যস্ফীতির হার এখনো অনেক বেশি এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি সংযত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ফেডের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প ওয়ার্শের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সমালোচনা করেছেন। এর আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার আরও কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ফেডের মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনও সেই লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। ফেডের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও উৎপাদনশীলতা শক্তিশালী থাকলেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়াও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি, পণ্য ও বিভিন্ন সেবার মূল্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা ফেডের কাজ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত সুদের হার ও অন্যান্য মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ ও চাহিদার ওপর প্রভাব ফেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ায়। এতে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায় এবং মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঋণ নেওয়া ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়। একই সঙ্গে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়তে পারে। এর ফলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদার চাপ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।

তবে এর বিপরীত প্রভাবও রয়েছে। সুদের হার বেশি হলে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও কিছুটা ধীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ফেডের সুদের হার বাড়ানোর প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ঋণবাজারে পড়তে পারে। নতুন করে বাড়ি কিনতে যাওয়া ব্যক্তিদের বন্ধকি ঋণের সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদও বাড়তে পারে।

সুদের হার বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্রের বড় কয়েকটি ব্যাংক তাদের প্রাইম লেন্ডিং রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। ফলে পরিবর্তনশীল সুদের ঋণ ও ক্রেডিট-ভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক পণ্যের খরচ বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সঞ্চয়কারীরা তুলনামূলক বেশি সুদ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। অর্থাৎ সুদের হার বাড়ার প্রভাব ঋণগ্রহীতা ও সঞ্চয়কারী—দুই পক্ষের ওপর ভিন্নভাবে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলে না; আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।

ফেড সুদের হার বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড ও অন্যান্য ডলারে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়তে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতে পারেন। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে পুঁজি বের হওয়ার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পুঁজি বেরিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমে গেলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের খরচ বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রার বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে এতে দেশীয় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ফেডের নতুন সিদ্ধান্তের পরও সুদের হার আরও বাড়তে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফেডের সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে নীতিনির্ধারকদের অধিকাংশই চলতি বছরের শেষ নাগাদ নীতি সুদের হার ৪ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশের মধ্যে দেখছেন।

তবে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ ভবিষ্যতে ঠিক কতবার বা কতটা সুদ বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেননি। ফেডের সিদ্ধান্ত মূলত মূল্যস্ফীতি, শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে।

ফেডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে দীর্ঘমেয়াদে ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার দিকে যেতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ঝুঁকি এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

ফেডের এই সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঋণগ্রহীতা ও সঞ্চয়কারীদের জন্য নয়, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ, বন্ডবাজার, মুদ্রাবাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17478 ,   Print Date & Time: Thursday, 17 September 2026, 10:02:46 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh