• হোম > অর্থনীতি > পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত হওয়ার ছয় মাসে আমানত ফেরত শুরু

পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত হওয়ার ছয় মাসে আমানত ফেরত শুরু

  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫০
  • ১০

---

 

ইবি রিপোর্ট

পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একই সঙ্গে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন করে আমানতও আসছে। এতে ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রমে প্রাথমিক অগ্রগতির একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক গত এপ্রিল থেকে দুর্বল ব্যাংক মোকাবিলা, আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার, তদারকি উন্নত করা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অবসানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে কাঠামোবদ্ধ ব্যাংক-সমাধান বা ‘রেজল্যুশন’ ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনে ১ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৯টি গ্রাহক আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনের বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৭৫২ জন গ্রাহককে ২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানান, ৭ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের আমানত ও অন্যান্য হিসাবে মোট ২ হাজার ২০ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এতে নতুন ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এ সময়ে নিয়মিত আমানত, উত্তোলন ও বিভিন্ন স্কিমের লেনদেনও অব্যাহত ছিল। প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে মোট ১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অনুমোদন পাওয়ার পরও কিছু গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ উত্তোলন করেননি। তারা পরে অর্থ উত্তোলন করবেন বলে ব্যাংককে জানিয়েছেন।

আবেদুর রহমান সিকদার জানান, ৭ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে মোট ৩ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন হয়েছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের আবেদনের বিপরীতে পরিশোধ করা ২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকাও রয়েছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ২৮১ জন গ্রাহক নগদে ৭৬২ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন) ও রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থায় ৬০ হাজার ২৩৩ জন গ্রাহক ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা স্থানান্তর করেছেন।

এ সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে ২৪ হাজার ৯৬৫টি হিসাব খোলা হয়েছে। এসব নতুন হিসাবধারী ৩০৩ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নতুন ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী করে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকটির কার্যক্রম এবং আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। লেনদেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়া আমানতকারী ও গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর আর্থিক ও সুশাসনসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিল।

ব্যাংকারদের মতে, একদিকে গ্রাহকের উত্তোলনের চাহিদা পূরণ এবং অন্যদিকে নতুন আমানত আকর্ষণ করতে পারা নতুন ব্যাংকটির প্রতি আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া বৃহত্তর পুনরুদ্ধার কর্মসূচির একটি ধাপ মাত্র। টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

গত ছয় মাসে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক মোকাবিলায় আইনি কাঠামোও শক্তিশালী করা হয়েছে। এপ্রিলে প্রণীত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংককে আর্থিকভাবে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা রেজল্যুশনের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা দিয়েছে। পরে সেপ্টেম্বরে সংসদ আইনের সংশোধনী পাস করে রেজল্যুশন কাঠামো আরও শক্তিশালী করেছে।

এ ছাড়া নতুন আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর আওতায় কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়বে।

সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমাধানে অর্থের জোগান দিতে ‘ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজল্যুশন তহবিল’ গঠনও সংস্কার কার্যক্রমের অন্যতম উদ্যোগ। এর লক্ষ্য দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা এবং বারবার সরকারি অর্থে উদ্ধার বা ‘বেইলআউট’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো।

একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা বা অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) জোরদার করেছে। ছয়টি শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত পর্যালোচনার ফলের ভিত্তিতেই পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নতুন ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা নির্দিষ্ট কিছু আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম গত ছয় মাসে শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল ৯টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসানের প্রক্রিয়া নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। এনবিএফআইয়ের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণের উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খাতটির সংকটের ব্যাপকতা বোঝাতে এ চিত্র গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকারদের মতে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা স্বীকার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগের পদ্ধতির তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তাদের মতে, টেকসই আস্থা ফেরাতে ব্যাংকগুলোকে স্বচ্ছ আর্থিক অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ আদায়ে সক্ষম হতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক ছাড় বা তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকা কোনো টেকসই সমাধান নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের সংকট কেবল তারল্যসংকট নয়; বরং এটি মূলধন ও সুশাসনসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত। তারা খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ এবং আর্থিক অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি পুরোপুরি তুলে ধরেনি।

তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে শ্বেতপত্র তৈরির সময় আমরা দেখেছি—প্রকৃত পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা।’

গত ছয় মাসে ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকির পাশাপাশি আইএফআরএস-৯-এর আওতায় প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি বা ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ (ইসিএল) কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও এগিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ঋণের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত সংস্থান রাখতে বাধ্য করা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম, অর্থ সরিয়ে নেওয়া ও অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করতে সরকার ফরেনসিক অডিটের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে বলে জানা গেছে।

তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতিকে ব্যাংকিং খাতের সংকটের পূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাতটিতে এখনো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সুশাসনের দুর্বলতা রয়েছে।

গত ছয় মাসের গুরুত্ব হলো—সমস্যাগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনি হাতিয়ার গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত, উত্তোলন, অর্থ স্থানান্তর ও নতুন হিসাব খোলার তথ্য রেজল্যুশন প্রক্রিয়া কীভাবে এগোচ্ছে, তার একটি প্রাথমিক চিত্র দিচ্ছে।

এখন ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন জোরদার এবং অন্য দুর্বল ব্যাংক ও এনবিএফআইকে সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠন বা অবসানের মাধ্যমে এই উদ্যোগ কতটা টেকসই হয়, সেটিই হবে পরবর্তী পরীক্ষার বিষয়।

ফলে গত ছয় মাসে দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম জরুরি সহায়তানির্ভর পদ্ধতি থেকে কাঠামোবদ্ধ রেজল্যুশন ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সেই নতুন ব্যবস্থার একটি বড় বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17459 ,   Print Date & Time: Wednesday, 16 September 2026, 12:22:49 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh