• হোম > জাতীয় | বাংলাদেশ > কারাগারেই মেয়ের জন্ম ও শৈশব, সাত বছর পর মুক্তি পেলেন কামরুন নাহার মনি

কারাগারেই মেয়ের জন্ম ও শৈশব, সাত বছর পর মুক্তি পেলেন কামরুন নাহার মনি

  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪৯
  • ১১

---

 

ইবি রিপোর্ট

ফেনীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ সাত বছর কারাবন্দী ছিলেন কামরুন নাহার মনি। কারাগারে থাকা অবস্থায় সন্তান জন্ম দেন তিনি। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে জীবনের প্রথম সন্তান জন্মদান এবং মেয়েকে লালন-পালন—সবকিছুরই সাক্ষী হয়েছে কারাগারের চার দেয়াল। ফলে মা কামরুন নাহার মনির সঙ্গে শিশু মোবাস্বেরা খানম রাথির শৈশবের সাতটি বছরও কেটেছে কারাগারেই।

হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়ার পর গতকাল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান কামরুন নাহার মনি। দীর্ঘ সাত বছরের কারাজীবনের কথা মনে করে মুক্তির সময় মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মনি জানান, কারাগারে মেয়েকে নিয়ে তার জীবন কেটেছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। মেয়েকে খেলানোর জন্য মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিতেন তিনি। আবার বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে মেয়েকে পড়াতেন। মা হিসেবে তিনি ও তার মেয়ের যে কষ্টের মধ্য দিয়ে সময় কেটেছে, তা কেউ বুঝতে পারবেন না বলেও জানান মনি।

একই সঙ্গে তাকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ফাঁসির আসামি করার বিচার দাবি করেছেন তিনি।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তার হন কামরুন নাহার মনি। বিচার চলাকালে তাকে প্রতি কার্যদিবসে আদালতে হাজির করা হয়।

মনির আইনজীবী একাধিকবার জামিনের আবেদন করেন। একই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদনও করা হয়। তবে আদালত এসব আবেদন নামঞ্জুর করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মনি। মেয়ের নাম রাখা হয় মোবাস্বেরা খানম রাথি। তবে মনি তাকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন।

সন্তানের বয়স যখন মাত্র এক মাস, তখন ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নিম্ন আদালত মনিসহ ১৬ আসামিকে ফাঁসির রায় দেন। এরপর দুগ্ধপোষ্য শিশুকে সঙ্গে নিয়ে মনিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে পাঠানো হয়।

দীর্ঘ কারাবাসের সময় আদালতের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন কামরুন নাহার মনি। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল।

মনির অভিযোগ, পেটে লাথি মেরে সন্তান নষ্ট করার হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে আদালতের পৃথক কোনো সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা হয়নি।

অধস্তন আদালতের রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় ফাঁসির সেলেই কাটাতে হয় তাকে। এ সময় পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মেয়েটিও মায়ের সঙ্গে কারাগারে বড় হতে থাকে।

পরিবারের আর্থিক সংকট ও ঋণের কারণে মনির মা নূর নাহারও নিয়মিত নাতনিকে দেখতে যেতে পারতেন না। ফলে শিশুটির বেড়ে ওঠার বড় একটি সময় মায়ের সঙ্গেই কারাগারে কেটেছে।

দীর্ঘ শুনানি শেষে ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত ১০ আসামিকে খালাস দেন। তাদের মধ্যে কামরুন নাহার মনিও রয়েছেন।

হাইকোর্টের রায়ে অন্য দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। পাশাপাশি চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের এই রায়ের পরই দীর্ঘ সাত বছরের কারাজীবনের অবসান ঘটে মনির। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জীবনে ফেরার সুযোগ পান তিনি।

হাইকোর্টের রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন মনির স্বামী রাশেদুল আলম খান।

তিনি জানান, বাবা হয়েও কড়া নিরাপত্তা ও দূরত্বের কারণে মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ পাননি। ফেনী ও কাশিমপুর কারাগারে শিকল ও জালের ফাঁক দিয়ে মেয়েকে দেখার চেষ্টা করার স্মৃতিও তিনি তুলে ধরেন।

কারাগারের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু মোবাস্বেরা খানম রাথির সঙ্গে বাবার এই দূরত্বের কথাও তার প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসে।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। পরে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। সেই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে নিম্ন আদালত মনিসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্ট সম্প্রতি মামলার রায় ঘোষণা করেন। সেই রায়ে কামরুন নাহার মনি খালাস পাওয়ায় প্রায় সাত বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পান। তার কারাজীবনের পুরো সময়জুড়ে মেয়ে রাথিও মায়ের সঙ্গে কারাগারের পরিবেশে বেড়ে উঠেছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17443 ,   Print Date & Time: Wednesday, 16 September 2026, 09:35:39 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh