
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গেমিং শিল্পে গত কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। ই-স্পোর্টস, মোবাইল গেমিং এবং গেমিং ইভেন্টকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগও বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক গেম নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অ্যাপসফ্লায়ারের গেমিং বিভাগের প্রডাক্ট ডিরেক্টর অ্যাডাম স্মার্ট সম্প্রতি জার্মানিতে অনুষ্ঠিত গেমসকমে অংশ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গেমিং শিল্পের সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি এ অঞ্চলের গেমিং বাজারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা তুলে ধরেন। খবর অ্যারাবিয়ান বিজনেসের।
স্মার্টের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের গেমিং ইভেন্টগুলোতে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় অংকের বিনিয়োগ করছে। এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে তিনি সৌদি আরবে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ই-স্পোর্টস বিশ্বকাপের কথা উল্লেখ করেন। ওই আয়োজনে ৩০ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি উপস্থিত হয়। অনলাইনে এর দর্শকসংখ্যা ছিল ৭৫ কোটির বেশি।
তবে শুধু বড় পরিসরের ই-স্পোর্টস বা গেমিং আয়োজন করলেই একটি শক্তিশালী ও টেকসই গেমিং শিল্প গড়ে ওঠে না বলে মনে করেন স্মার্ট। তার মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ গেমিং ইকোসিস্টেম তৈরির জন্য খেলোয়াড়, গেম নির্মাতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ এবং সৃজনশীল দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন।
গেমিং বাজারের পরিবর্তনশীল প্রবণতাগুলোর মধ্যে নারী গেমারদের গুরুত্ব বাড়াকে অন্যতম হিসেবে দেখছেন অ্যাডাম স্মার্ট। গেমসকমে এবার নারী খেলোয়াড়দের কথা মাথায় রেখে তৈরি ও বিপণন করা অনেক গেম দেখা গেছে বলে জানান তিনি।
স্মার্ট বলেন, নান্দনিকতা, চরিত্রের সাজসজ্জা এবং সামাজিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া গেমগুলোর জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। তার মতে, গেম নির্মাণ ও বিপণনের ক্ষেত্রে নারী খেলোয়াড়দের পছন্দ ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের মোবাইলনির্ভর গেমিং সংস্কৃতিকে পিছিয়ে থাকার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না স্মার্ট। বরং তিনি এটিকে এ অঞ্চলের একটি সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ গেমার স্মার্টফোনে গেম খেলেন। ফলে মোবাইল গেমের ব্যবহারকারী সংগ্রহ এবং আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতোমধ্যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।
স্মার্টের মতে, মোবাইলনির্ভর এই বড় ব্যবহারকারীভিত্তি মধ্যপ্রাচ্যের গেমিং কোম্পানিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্মার্টফোনকেন্দ্রিক গেমের বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যবহারকারীদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে মোবাইল গেমিংয়ের পাশাপাশি কনসোল গেমিংয়ের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করেন স্মার্ট। তার মতে, গ্র্যান্ড থেফট অটো (জিটিএ) ৬-এর মতো বড় গেম বাজারে এলে উপসাগরীয় অঞ্চলে কনসোল গেমিংয়ের ব্যবহার বাড়তে পারে।
এ ধরনের বহুল প্রত্যাশিত বড় গেমের বাজারে আসা কনসোল গেমিংয়ের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। এর ফলে বর্তমানে মোবাইলনির্ভর গেমিংয়ে শক্ত অবস্থানে থাকা বাজারে কনসোল গেমের ব্যবহারও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গেমিং খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় দুবাইয়ের গেমিং কোম্পানির সংখ্যা থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দুবাইয়ে ৩৬৮টির বেশি গেমিং কোম্পানি ছিল। ২০২৬ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৫টিতে।
এতে শহরটিতে গেমিং-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও উদ্যোগের বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দুবাই ২০৩৩ সালের মধ্যে গেমিং-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে।
সৌদি আরবও গেমিং শিল্পকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। দেশটির বড় পরিসরের ই-স্পোর্টস আয়োজন এবং এ খাতে বিনিয়োগ সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে অ্যাডাম স্মার্ট সতর্ক করে বলেছেন, শুধু গেমিং কোম্পানির নিবন্ধন, খেলোয়াড়ের সংখ্যা কিংবা বড় অংকের বিনিয়োগ থাকলেই একটি টেকসই সৃজনশীল শিল্প গড়ে উঠবে না। দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, সৃজনশীলতা, গেম নির্মাণের সক্ষমতা এবং কার্যকর বাজারব্যবস্থা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো গত কয়েক বছরে গেমিং শিল্পে বড় বিনিয়োগ করলেও সামনে এই বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্মার্ট। গেমসকমে দেখা বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগের দিকগুলোরও যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক গেম নির্মাতাদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ই-স্পোর্টস ও গেমিং আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবেও এ অঞ্চলের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।