
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের নিটওয়্যার পোশাক খাত বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। সংকটের কারণে অর্ধেকের বেশি, প্রায় ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার পোশাক কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমে গেছে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য পাঠাতে বা শিপমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন দেশের ৮৭ শতাংশ নিটওয়্যার রপ্তানিকারক।
মঙ্গলবার পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকট এবং পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে ৮৭ শতাংশ রপ্তানিকারক নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে পারেননি।
সময়ে শিপমেন্ট করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় দুইজন সাপ্লায়ার। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ অর্ডার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএ জানিয়েছে, সংগঠনটির সদস্যভুক্ত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০০। সে হিসাবে ২০ শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকট এবং ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকটে প্রভাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে। একই সময়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাসের চাপ ৭৮ শতাংশ কম ছিল বলে জরিপে উঠে এসেছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিকেএমইএর জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। একই সংখ্যক কারখানা অর্থাৎ প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শ্রমঘণ্টারও অপচয় হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে কারখানাগুলো নির্ধারিত উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু উৎপাদন ও রপ্তানি শিপমেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পোশাক কারখানার মালিকেরা।
জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ কারখানা মালিক জানিয়েছেন, তারা বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভবিষ্যতে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে তিন-চতুর্থাংশের বেশি কারখানা মালিক জানিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের কারখানার উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কারখানাগুলোর আর্থিক চাপও বাড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনের মধ্যে ছয়জন কারখানা মালিক জানিয়েছেন, চলমান সমস্যার কারণে তাদের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া ৭ শতাংশ কারখানা মালিক জানিয়েছেন, সংকটের কারণে তাদের পুরো কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিকেএমইএর জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি নিটওয়্যার খাতের উৎপাদন, রপ্তানি আদেশ, শিপমেন্ট, শ্রমঘণ্টা এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠাতে না পারা এবং বিদেশি ক্রেতাদের ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের নিটওয়্যার খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভবিষ্যৎ রপ্তানি আদেশ এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।