
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এর সঙ্গে ভারী হচ্ছে ঋণের সুদের বোঝাও। ২০২৫ সালে বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির আন্তর্জাতিক জোট অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলোর ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অনেক দেশের ক্ষেত্রে এ ব্যয় তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ এখন বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা খাতের তুলনায় সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারীর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে সরকারি বন্ডের ইল্ডও প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আগের নেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ঋণ নিতে গিয়ে সরকারগুলোকে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মোট ঋণ গত মাসে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি বছর শুধু ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোই সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ লাখ কোটি ডলার ঋণ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটিও একটি নতুন রেকর্ড।
বন্ডবাজারে সাম্প্রতিক বিক্রির চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জি৭ভুক্ত দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় ইল্ড এখন প্রায় ৪ শতাংশ। ২০০৮ সালের পর এই হার প্রথমবারের মতো এতটা বেড়েছে।
এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। কোভিড-১৯ মহামারীর পর বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়িয়েছে। একই সময়ে সরকারগুলোও বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বন্ড কেনার কর্মসূচি বা কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (কিউই) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্ডের দাম কমেছে এবং ইল্ড বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদহার কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে সরকারগুলোর নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় কমার সম্ভাবনাও কমছে।
ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের ফান্ড ম্যানেজার মাইক রিডেল বলেন, পুরনো সরকারি ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সরকারগুলোকে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। কিন্তু সুদের হার বেশি থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।
ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে কম প্রবৃদ্ধির বড় অর্থনীতিগুলোতে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এর বড় উদাহরণ।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি পাউন্ড ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ২০২২ সালে দেশটির সরকারি বন্ডের ইল্ড দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। বর্তমানে ব্রিটিশ বন্ডের ইল্ড আরও বেশি।
ফ্রান্সেও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর ঋণের চাপ রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর দেশটিতে তিনজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। এর পেছনে দেশটির আর্থিক চাপও একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের সরকারের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো সরকারি ব্যয় কমাতে হবে।
কিন্তু সরকারি ব্যয় কমালে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অন্যান্য কৌশলগত খাতে নতুন করে ব্যয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ শুধু অর্থনীতির ওপর নয়, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে দেশটির ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় দ্বিগুণ হবে। ২০৪৭ সালের পর এ ব্যয় সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সরকারগুলোর আর্থিক চাপের পেছনে শুধু সুদের হার বাড়াই দায়ী নয়; ঋণের পরিমাণও বড় কারণ। কোভিড-১৯ মহামারী ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো ব্যাপক ব্যয় করেছে। অন্যদিকে এসব সংকটের পর অনেক দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দুর্বল হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, গত বছর বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে। মহামারীর আগের বছরের তুলনায় এটি ১০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি।
আইএমএফের ধারণা, চলতি দশকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
শুধু সরকারি খাত নয়, বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হিসাবে, বিশ্বে সরকারি ও করপোরেট ঋণের সম্মিলিত পরিমাণ এখন ৩০০ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ ধার করছে। ফলে ঋণের অর্থের জন্য তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এই প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারগুলোর পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত বাড়তি সুদের বোঝা সরকারি ব্যয়, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ ঋণ, বাড়তি সুদহার ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।