
ইবি রিপোর্ট
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক খাতের ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মধ্যেও দেশের ব্যাংক খাতে কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবগুলোর বিপরীতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৫ লাখ কোটি টাকা। তিন মাস আগে, মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৫৯ লাখ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি দেশে ধনী বা কোটিপতি মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এসব হিসাবের বড় একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক। তাদের ধারণা, মোট হিসাবের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির, আর বাকি বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংক আমানত সাধারণত প্রতিবছরই বাড়ে। কোনো কোনো সময়ে এর প্রবৃদ্ধি বেশি হয়, আবার কখনো কম হয়। ফলে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যাও সময়ের সঙ্গে বাড়া স্বাভাবিক।
তারা আরও জানান, মোট ব্যাংক আমানত যে হারে বাড়ছে, তার তুলনায় কোটি টাকার হিসাবগুলোর আমানত বৃদ্ধির হার কম। জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক খাতে মোট আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। বিপরীতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোর আমানত বেড়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর আগের বছর এ শ্রেণির আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।
ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের অর্থনীতির আকার এবং ধনিক শ্রেণির সংখ্যার তুলনায় ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা খুবই কম। তাই শুধু এসব হিসাবের তথ্য দিয়ে দেশের সম্পদের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, ধনী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ব্যাংকে অর্থ না রেখে জমি, বাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করেন। আবার ধনিক শ্রেণির একটি অংশের বিরুদ্ধে উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনাসহ বিলাসী জীবনযাপনের প্রবণতার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ভ্যাট-কর এবং হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ধনী ব্যক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে চলেন বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। কেউ কেউ ব্যাংকে অর্থ রাখলেও বড় অঙ্কের টাকা একটি হিসাবে না রেখে একাধিক হিসাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে রাখেন।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংক খাতের চলমান সংকটও ধনিক শ্রেণির একটি অংশকে ব্যাংকবিমুখ করছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেঘনা ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকে অতিধনীদের জমা অর্থের পরিমাণ খুবই কম।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে দেশে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও প্রকট। কিন্তু ব্যাংক হিসাবের তথ্য সেই বৈষম্যের পুরো প্রতিফলন ঘটায় না।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এত বড় জনসংখ্যার একটি দেশে ব্যক্তিশ্রেণির মাত্র ১২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তার মতে, এর অর্থ হতে পারে অতিধনীরা ব্যাংকে অর্থ রাখছেন না অথবা একই ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থ রাখতে স্বস্তি বোধ করছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩৪ লাখ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি এসব হিসাবে থাকা মোট আমানতের পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এ ধরনের উপাত্ত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোটি টাকার হিসাবগুলোর ধরন বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিশ্রেণির কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়লে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখার কারণ নেই। তবে একজন ব্যক্তির বৈধ আয়, বেতন-ভাতা, ব্যবসার আয় এবং মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কত সময়ে কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব, সেটিও দেখা প্রয়োজন।
আরিফ হোসেন খান বলেন, কারও আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে ব্যাংক হিসাবে দ্রুত অর্থ বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তার মতে, কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়ার আরেকটি দিকও রয়েছে। আরও বেশি মানুষ কোটিপতি হওয়া সম্পদের বণ্টন আরও অসম হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। অল্প কিছু মানুষের হাতে অতিরিক্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাটের বিষয়টি অনেক মানুষকে নিরুৎসাহিত করে।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, কর ফাঁকির উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা করেন। আবার আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় বৈধ অর্থও ব্যাংকে রাখতে অনেকে ভয় পান।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে থাকা ভয় ও অনাস্থার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের অপপ্রয়োগ যাতে মানুষের জন্য হয়রানি বা বিপদের কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণ বাড়লেও এর ভিত্তিতে দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা কতটা বেড়েছে, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। কারণ এসব হিসাবের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত সম্পদের বড় একটি অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরেও থাকতে পারে।