
ইবি রিপোর্ট
রাজশাহীর আম, টাঙ্গাইলের শাড়ি, সিলেটের চা, রংপুরের শতরঞ্জি, কুমিল্লার খাদি কিংবা সিলেট ও ঝালকাঠির শীতলপাটি—বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে এসব পণ্যের পরিচয় দীর্ঘদিনের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষের দক্ষতা, মেধা, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতায় গড়ে ওঠা এসব পণ্য মানুষের জীবিকার পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ হয়ে আছে।
তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এসব পণ্যের অনেকগুলো এখনো স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। দুর্বল বাজারব্যবস্থা, আধুনিক নকশা ও মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিং, অর্থায়নের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগের কারণে উৎপাদকরা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
এই বাস্তবতা বদলাতে গ্রামকে শুধু উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে উদ্যোক্তা, শিল্প, সৃজনশীলতা ও বাজারের সমন্বিত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের পুরোনো পরিচয়কে নতুন ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়া, গ্রামীণ কারিগরকে উদ্যোক্তায় পরিণত করা এবং গ্রামের উৎপাদনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচিকে বৃহত্তর ক্রিয়েটিভ ইকোনমি কাঠামোর অংশ হিসেবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনায় ঐতিহ্যবাহী ও সৃজনশীল পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর মানোন্নয়ন, আধুনিক ডিজাইন, বাজার সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাজেটে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে কর্মসূচির পাইলট পর্যায়ে শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প ও বুননশিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন গ্রামের সম্ভাবনাময় একটি পণ্যকে ব্র্যান্ডে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় প্রায় ৭৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেনের মতে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানকে যুক্ত করা জরুরি।
অর্থাৎ ‘এক গ্রাম এক পণ্য’কে শুধু কারুশিল্পভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে না দেখে প্রান্তিক মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির অবদান মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তাঁর মতে, কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইন কতটা শক্তিশালী করা যায় তার ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক মানের কাঁচামাল, আধুনিক পণ্যের নকশা, মান সনদ, প্যাকেজিং, জিআই ও কপিরাইট সুরক্ষা, ই-কমার্স, নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস এবং সরাসরি বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল জানিয়েছেন, ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ উদ্যোগটি শিগগিরই চালু করার কাজ চলছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্র এখন শুধু ঢাকা বা বড় শহর নয়; গ্রামকেও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলাই লক্ষ্য।
তিনি বলেন, একটি গ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি পরিবারের কল্যাণ, শিশুদের শিক্ষা, যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য এবং পরিবারের স্থায়ী আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি করাও গ্রামের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের মতে, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ মানে শুধু একটি পণ্য উৎপাদন নয়; বরং একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিচয়কে টেকসই ব্যবসায়িক শক্তিতে রূপান্তর করা।
তাঁর বিশ্লেষণে, বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে কাঁচামাল, দক্ষতা, ঐতিহ্য ও উৎপাদনের ভিত্তি আগে থেকেই রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এসব সক্ষমতা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
কোথাও একজন তাঁতি কাপড় তৈরি করছেন, অন্যজন রং করছেন, কেউ প্যাকেজিং করছেন, আবার অন্য কেউ বাজারে বিক্রি করছেন। ফলে উৎপাদক কম দাম পাচ্ছেন, অথচ ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
এই ব্যবধান কমাতে পণ্যভিত্তিক ক্লাস্টার গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন সাকিফ শামীম। একই এলাকায় কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, স্থানীয় উৎপাদক ও উদ্যোক্তাকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রেখে সরকারকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।
গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ডিজিটাল অর্থনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সাকিফ শামীম।
উৎপাদন, বিক্রি, লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বিকল্প ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরি করা গেলে জামানতনির্ভর ঋণের বাইরে গিয়ে ক্যাশফ্লোভ-ভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে না। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অনেকের পর্যাপ্ত ডিজিটাল দক্ষতা, স্মার্টফোন বা নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নেই। তাই ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় সহায়তা কেন্দ্র এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপুলসংখ্যক নারী পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। কিন্তু তাঁদের অনেকেই আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক কাঠামোর বাইরে থাকেন।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করা যেতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করতে গ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে।
এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন সংগঠন, সংগ্রহ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং সংযোগ এবং ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন নয়, বাজার। ভালো পণ্য তৈরি করলেই ক্রেতা পাওয়া নিশ্চিত হয় না। আধুনিক প্যাকেজিং, পণ্যের নকশা, ব্র্যান্ডিং, সার্টিফিকেশন, ডিজিটাল বিপণন এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন।
স্থানীয় পণ্যকে জাতীয় ব্র্যান্ডে পরিণত করতে এসব বিষয়কে উৎপাদন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খুচরা বিক্রেতা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, রপ্তানিকারক এবং করপোরেট ক্রেতাদের সঙ্গে গ্রামীণ উৎপাদক ক্লাস্টারের সরাসরি যোগাযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি উৎপাদক দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা ও বাজার সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও উৎপাদনের প্রথম ধাপ থেকেই মান, নিরাপত্তা, সার্টিফিকেশন, প্যাকেজিং ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় বাজারে জনপ্রিয় কোনো পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রপ্তানিযোগ্য হয়ে যায় না—আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য আলাদা প্রস্তুতি প্রয়োজন।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ধারণার আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে জাপানের ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ বা OVOP আন্দোলনের কথা উঠে এসেছে।
১৯৭৯ সালে জাপানের ওইতা প্রিফেকচারের গভর্নর মোরিহিকো হিরামাতসু এই আন্দোলন শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষকে তাঁদের নিজস্ব সম্পদ, দক্ষতা ও ঐতিহ্যের ওপর দাঁড় করিয়ে এমন পণ্য ও উদ্যোগ গড়ে তোলা, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৃহত্তর বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারে।
OVOP-এর অন্যতম শিক্ষা ছিল স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিচয়কে টেকসই ব্যবসায়িক শক্তিতে রূপান্তর করা। স্থানীয় মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে তাঁদের এলাকার সম্ভাবনা কোথায়, আর সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন, অবকাঠামো, ব্র্যান্ডিং ও বাজারসংযোগে সহায়তা করবে।
অর্থাৎ উৎপাদনের ভিত্তি থাকবে স্থানীয়, কিন্তু বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি হবে বৈশ্বিক।
বাংলাদেশের জন্যও এ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশের গ্রামগুলোতে ইতোমধ্যেই রয়েছে অসংখ্য পণ্য, কারিগরি দক্ষতা, কৃষিভিত্তিক সম্পদ ও ঐতিহ্য। এখন প্রয়োজন এসব সম্ভাবনাকে সংগঠিত করে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুর রহমান জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক চুক্তি করেছে।
রিভলভিং ফান্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা ১ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন। ঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ। নারী, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
‘এক গ্রাম এক পণ্য’ বাস্তবায়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের বিদ্যমান অর্থায়ন কাঠামোকে গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে উদ্যোক্তাদের বড় একটি বাধা দূর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারের পরিকল্পনায় ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির অন্যতম বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ হলো পূর্বাচলে ১৬০ একর জমিতে একটি বিশ্বমানের সেন্ট্রাল ক্রিয়েটিভ হাব প্রতিষ্ঠা।
এর পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব হাবে পণ্যের প্রদর্শনী, বিপণন, প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন এবং বাজারসংযোগের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
সিএসইআরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রতিটি গ্রামের জন্য প্রশাসন বসে একটি পণ্য নির্ধারণ করে দিলে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ধারণার মূল দর্শন ব্যাহত হতে পারে। কোন এলাকায় কী উৎপাদনের দক্ষতা রয়েছে, কী ধরনের কাঁচামাল সহজলভ্য, স্থানীয় বাজারের চাহিদা কী এবং বৃহত্তর বাজারে ওই পণ্যের সম্ভাবনা কতটা—এসব বিবেচনা করে পণ্য নির্বাচন করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তাদের। সরকারকে কাজ করতে হবে সহায়ক শক্তি হিসেবে।
‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগকে শুধু কোনো একটি পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যেতে পারে। বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন, অর্থায়ন ও বিপণন—পুরো ভ্যালু চেইনকে শক্তিশালী করাই হবে এর মূল লক্ষ্য।
সিএসইআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামকে শুধু কৃষি বা শ্রমের উৎস হিসেবে না দেখে উৎপাদন, উদ্যোক্তা, ডিজাইন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বাজারের সমন্বিত অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প, বুনন, আম, খাদি কিংবা অন্যান্য স্থানীয় পণ্য যদি ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে এর সুফল শুধু একটি পণ্যের বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাড়তে পারে আয়, তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থান, সংরক্ষিত হতে পারে ঐতিহ্য এবং নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রাম হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনার জায়গা।
গ্রাম থেকে বাজার, বাজার থেকে জাতীয় ব্র্যান্ড এবং জাতীয় ব্র্যান্ড থেকে বিশ্ববাজার—এই পথ তৈরি করাই এখন ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।