• হোম > বাণিজ্য > জ্বালানি আমদানিতে একই ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাবের অভিযোগ

জ্বালানি আমদানিতে একই ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাবের অভিযোগ

  • সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:০৮
  • ১০

---

ইবি রিপোর্ট

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামো বদলেছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশও পেয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি। এতে আমদানিতে প্রতিযোগিতা, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সরকারের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিপিসির নথি ও দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড।

সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম এসেছে।

ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠান আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ একই ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর মূল্যপ্রস্তাব, মান, সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দরপত্রের শর্ত পূরণের মতো একাধিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানির কার্যাদেশ গেছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। মোট কার্যাদেশের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭৮ শতাংশ।

এই পরিমাণই অবশ্য অনিয়মের প্রমাণ নয়। বরং এত বড় অংশের কার্যাদেশ একই স্থানীয় ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে আসায় প্রতিযোগিতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহকারীদের সংখ্যা, দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং মূল্যপ্রস্তাবের মধ্যে কী ধরনের প্রতিযোগিতা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

জুন-আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনায় চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর।

পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে ভিটল এশিয়া। পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পেয়েছে ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে ভিটল এশিয়া।

চারটি প্যাকেজের মধ্যে তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জ্বালানি আমদানির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করা হয়। এসব উপাদানের ওপর ভিত্তি করে সরবরাহকারীর প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি দরপত্রে কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল ডিজেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার।

পরবর্তী জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ওই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রিমিয়াম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ ছিল। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের বাইরে সরবরাহকারীর সংখ্যা এবং প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা প্রিমিয়াম বাড়াতে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না।

এটি যাচাই করতে একই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারদরের সঙ্গে বিপিসির ক্রয়মূল্যের তুলনা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। অর্থাৎ শুধু প্রিমিয়াম বেড়েছে কি না, তা নয়; একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল এবং অন্যান্য সম্ভাব্য সরবরাহকারীর প্রস্তাব কী ছিল, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

সরবরাহের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্নের সূত্র পাওয়া গেছে। বিপিসির নথিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতার কথা জানিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মতো সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতাও সংকটের সময়ে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে সরবরাহ থেকে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সরবরাহের বহুমুখীকরণও জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ কিংবা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন।

যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে যে ভবনে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় রয়েছে, সেখানেই এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় থাকার তথ্যও অনুসন্ধানে এসেছে।

তবে অবসরের পর কোনো সাবেক কর্মকর্তা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আগের দায়িত্ব, বর্তমান প্রতিষ্ঠানে তাঁর ভূমিকা এবং বিপিসির সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানের চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে। তবে তৃতীয় কোনো দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সেই যোগ্যতার পক্ষে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করা গেলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17319 ,   Print Date & Time: Monday, 14 September 2026, 01:07:13 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh