
ইবি রিপোর্ট
অতিরিক্ত ক্লান্তিকে অনেক সময় বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব, মানসিক চাপ কিংবা নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির সঙ্গে যদি বারবার সংক্রমণ, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, রাতে অতিরিক্ত ঘাম কিংবা রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) অডিওলজিস্ট সারাহ চ্যাপম্যান। একসময় তিনি নিয়মিত হকি খেলতেন এবং রক্তদানও করতেন। কিন্তু ২০১১ সালে হঠাৎ তিনি অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন।
একপর্যায়ে তার বুকে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং শরীরের বিভিন্ন ক্ষত আগের তুলনায় ধীরে শুকাতে শুরু করে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার পর তার এসব সমস্যাকে মেনোপজের উপসর্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে সারাহর মনে হয়েছিল, তার শরীরে অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এতটাই কমে যায় যে তিনি আর রক্তদান করতে পারছিলেন না। এরপর শুরু হয় আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
২০২৩ সালে সারাহর শরীরে মায়েলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম (এমডিএস) ধরা পড়ে। তাকে জানানো হয়, পাঁচ বছরের মধ্যে এই রোগ লিউকেমিয়ায় রূপ নিতে পারে।
লিউকেমিয়া হলো রক্তকণিকা উৎপাদনকারী টিস্যুর এক ধরনের ক্যানসার। এ রোগে অস্বাভাবিক রক্তকণিকা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে। ফলে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
শরীরের জন্য সুস্থ রক্তকণিকাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এগুলোর ঘাটতি দেখা দিলে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্লান্তি, বারবার সংক্রমণ এবং রক্তপাতের মতো সমস্যা। লিউকেমিয়ার ধরন অনুযায়ী এসব উপসর্গ ধীরে ধীরে অথবা হঠাৎ করেও দেখা দিতে পারে।
লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হলে সব সময় স্পষ্ট বা নির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণকে সতর্কতামূলক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. দীর্ঘস্থায়ী বা কারণহীন ক্লান্তি ও দুর্বলতা;
২. ঘন ঘন সংক্রমণ বা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া;
৩. জ্বর অথবা রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া;
৪. ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া;
৫. কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া বা ক্ষুধামন্দা;
৬. সহজেই শরীরে কালশিটে পড়া বা রক্তপাত হওয়া;
৭. ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া;
৮. ক্ষত শুকাতে বা সারতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগা;
৯. লিম্ফ নোড বা লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া;
১০. হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা অথবা মাথা ঘোরা।
এসব উপসর্গের কোনো একটি থাকলেই যে লিউকেমিয়া হয়েছে, এমন নয়। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক উপসর্গ থাকলে বা রক্ত পরীক্ষায় অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লিউকেমিয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ চিহ্নিত করা যায় না। জিনগত পরিবর্তনের কারণে রক্তকণিকা উৎপাদনকারী কোষ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি ও বিভাজিত হতে শুরু করলে এ রোগ দেখা দিতে পারে।
তবে কিছু বিষয় লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বয়স বৃদ্ধি, কিছু বংশগত বা জিনগত সমস্যা, আগে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া, উচ্চমাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে আসা এবং বেনজিনের মতো কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ।
সারাহ চ্যাপম্যানের ঘটনা মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম (এমডিএস) এবং অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া (এএমএল)-এর মধ্যকার সম্পর্কও সামনে আনে।
মায়েলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম এমন একটি রোগ বা ব্যাধি, যার ফলে অস্থিমজ্জা স্বাভাবিকভাবে সুস্থ রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। এমডিএসে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে এএমএল দেখা দিতে পারে।
এ কারণেই রক্তকণিকার সংখ্যায় দীর্ঘস্থায়ী কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও রক্ত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক অস্থিমজ্জা পরীক্ষারও পরামর্শ দিতে পারেন।
লিউকেমিয়ার কারণে শরীরে সুস্থ রক্তকণিকার ঘাটতি তৈরি হলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতির কারণে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে প্রচণ্ড ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে সুস্থ শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে গেলে শরীরের পক্ষে বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আবার প্লেটলেটের সংখ্যা কমে গেলে শরীরে সহজেই কালশিটে বা আঘাতের দাগ দেখা দিতে পারে এবং গুরুতর রক্তপাতের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে অস্বাভাবিক কোষ অস্থিমজ্জার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুকে আক্রান্ত করতে পারে। তখন চিকিৎসাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হলে তীব্র দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, চুল পড়ে যাওয়া, রক্তকণিকার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বাভাবিক ক্লান্তিকে সবসময় বয়স, মানসিক চাপ বা মেনোপজের স্বাভাবিক উপসর্গ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে বারবার সংক্রমণ, অস্বাভাবিক রক্তপাত, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া, রাতের বেলায় অতিরিক্ত ঘাম বা রক্ত পরীক্ষায় পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।