• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | ব্যাংক > ব্যাংকের এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নতুন কেপিআই চালু

ব্যাংকের এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নতুন কেপিআই চালু

  • সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪
  • ২৭

---

 

ইবি রিপোর্ট

দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নতুন নির্দেশিকা বা ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস’ (কেপিআই) ফ্রেমওয়ার্ক চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই কাঠামোর আওতায় প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রায় ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে ব্যাংকপ্রধানদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কেপিআই কাঠামো জারি করেছে। একই সঙ্গে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের নতুন নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকে নতুন এমডি বা সিইও নিয়োগের পরবর্তী বোর্ড সভাতেই এই কাঠামোর আলোকে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর তা চূড়ান্ত করা হবে। বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত এমডি ও সিইওদের ক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের কর্মদক্ষতার ওপর প্রথম মূল্যায়ন শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কে মোট পাঁচটি প্রধান খাতে ১০০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ব্যাংকের সচ্ছলতা ও তারল্য বা সলভেন্সি ও লিকুইডিটি খাতে ২৫ শতাংশ, সম্পদের গুণগত মান বা অ্যাসেট কোয়ালিটি খাতে ২৫ শতাংশ এবং সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ২৫ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ শতাংশ এবং মুনাফাযোগ্যতার জন্য ১০ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পাঁচটি প্রধান খাতের অধীনে প্রায় ৩০টি নির্দিষ্ট সূচকে ব্যাংকের এমডি ও সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।

কেপিআই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে মূলধন ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত বা সিআরএআর, নিট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও বা এনএসএফআর, মোট ও নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, সম্পদের বিপরীতে আয় বা আরওএ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান পরিপালন এবং মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বা এএমএল/সিএফটি কমপ্লায়েন্স।

এ ছাড়া কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই এবং কৃষি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।

স্কোর অনুযায়ী তিন শ্রেণি

মূল্যায়নে ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের ‘গড় মানের উপরে’ বা অ্যাবোভ অ্যাভারেজ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বর পাওয়া এমডি ও সিইওদের ‘গড় মানের’ বা অ্যাভারেজ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হবে। আর ৬৫-এর নিচে নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের ‘গড় মানের নিচে’ বা বিলো অ্যাভারেজ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ ধরনের ফলাফলকে তাঁদের কর্মদক্ষতার অবিলম্বে উন্নতির প্রয়োজন হিসেবে দেখা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব এমডি ও সিইও ৬৫ শতাংশের নিচে নম্বর পাবেন, তাঁদের সতর্ক করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে তাঁদের পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হলে বা ব্যর্থতা দেখা দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় পদ থেকে অপসারণের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কে আরও একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট ছয়টি বিষয়ে ঘাটতি থাকলে মোট স্কোর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়া যাবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাহী ১০০-এর মধ্যে ৭৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেও যদি ওই ছয়টি বিষয়ের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁর স্কোর থেকে ৫ দশমিক ০৮ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হবে। ফলে চূড়ান্ত স্কোর দাঁড়াবে ৭০ দশমিক ৪২।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সূচকের মধ্যে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, মন্দ ঋণের পরিমাণ, খেলাপি ঋণ থেকে বার্ষিক নগদ আদায় এবং অবলোপন বা রাইট-অফ করা ঋণের পরিমাণ বিবেচনা করা হবে।

ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডিআর-এর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন বিষয় দেখা হবে। এর মধ্যে থাকবে ব্যাংকের মোট আমানতের কত অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে, নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ৮৫ শতাংশ বা ৮৭ শতাংশ সীমা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না।

ঋণ কেন্দ্রীকরণ বা কনসেন্ট্রেশন সূচকের মাধ্যমে ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ শীর্ষ ১০ বা ২০ জন গ্রাহকের মধ্যে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে কি না, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে।

একই সঙ্গে ব্যাংক একক গ্রাহক ঋণসীমা বা সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট যথাযথভাবে মেনে চলছে কি না, তাও দেখা হবে।

এর পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতেও ব্যাংকের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে। সিএমএসএমই, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থায়ন বা গ্রিন ফাইন্যান্স-এর পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নতুন গ্রাহকদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার উদ্যোগও এতে বিবেচনায় থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী। তবে তাঁর মতে, প্রতি ছয় মাসে একবার মূল্যায়ন করার পরিবর্তে সময়সীমা এক বছর করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে।

তিনি বলেন, যেকোনো চাকরিতে জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। ব্যাংকের এমডিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে, সেটিকে তিনি ভালো পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তাঁর মতে, ছয় মাস অন্তর মূল্যায়ন করা কিছুটা আগাম হয়ে যায়; এক বছর মেয়াদি মূল্যায়ন হলে তা আরও ভালো হতে পারে।

আরফান আলী আরও বলেন, অনেক ব্যাংকের এমডি চেয়ারম্যানকে সন্তুষ্ট রেখে দীর্ঘদিন চাকরি করে থাকেন। নিয়োগের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁদের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলেও নির্ধারিত কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সার্বক্ষণিক তদারকি থাকলে ব্যাংক খাতে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কেপিআই কাঠামোর ফলে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কর্মদক্ষতা এখন নির্দিষ্ট সূচক ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের আওতায় আসছে। বিশেষ করে মূলধন, তারল্য, খেলাপি ঋণ, সুশাসন, গ্রাহকসেবা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও মুনাফাযোগ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যাংকপ্রধানদের জবাবদিহিতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17284 ,   Print Date & Time: Monday, 14 September 2026, 08:28:43 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh