• হোম > বিশ্ববাণিজ্য > উচ্চ কর ও অনিশ্চয়তায় যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন ধনী ও বিনিয়োগকারীরা

উচ্চ কর ও অনিশ্চয়তায় যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন ধনী ও বিনিয়োগকারীরা

  • রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:২৬
  • ১০

---

 

ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

উচ্চ করের চাপ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন দেশটির ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ করসুবিধা দিয়ে অতিধনী ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের নিজেদের দেশে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

সর্বশেষ যুক্তরাজ্য ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশটির অন্যতম শীর্ষ করদাতা ও হেজ ফান্ড রোকোস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস রোকোস। দাতব্য কর্মকাণ্ডের জন্যও পরিচিত এই ধনকুবের যুক্তরাজ্য ছেড়ে গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রোকোসের দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ সরকারের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যে ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের ওপর করের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে ব্যবসায়ী ও তাঁদের কর পরামর্শকেরা বলছেন, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত এক দশকে যুক্তরাজ্যে ধনী ব্যক্তিদের জন্য করব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে বিদেশে স্থায়ী আবাস থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রচলিত বিশেষ করসুবিধা ‘নন-ডম’ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে আগে এই ব্যবস্থার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের ওপরও করের চাপ বেড়েছে।

এ ছাড়া গত দুই বছরে উত্তরাধিকার, পেনশন তহবিল, প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগের মুনাফা, নিয়োগকর্তার জাতীয় বিমা চাঁদা এবং মূলধনি মুনাফার ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে ভবিষ্যতে তাঁদের করভার আরও বাড়তে পারে।

বিডিওর ব্যক্তিগত করবিষয়ক অংশীদার এলসা লিটলউড বলেন, তাঁদের অনেক গ্রাহক মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের করব্যবস্থায় এত বেশি পরিবর্তন এসেছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের কাছে এখন করব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্য থেকে ঠিক কতজন ধনী ব্যক্তি চলে যাচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া কঠিন। ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বিভাগ এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমসের (এইচএমআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ করবর্ষে নন-ডম করদাতার সংখ্যা ছিল ৭৩ হাজার ৪০০। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৪০০ জন।

তবে বেসরকারি ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ও কর পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তবে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়া ধনী ব্যক্তির সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে।

অতিধনী ব্যক্তিদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ এখন যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার কর। নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদের ওপর এই করের হার ৪০ শতাংশ। নতুন নিয়মে বিদেশে থাকা সম্পদও যুক্তরাজ্যের উত্তরাধিকার করের আওতায় এসেছে।

এক আন্তর্জাতিক প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানান, তাঁর পরিচিত অনেক ব্যক্তি ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ছেড়ে গেছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বক্তব্য, বিদেশে থাকা সম্পদের ওপর উত্তরাধিকার কর তুলে দেওয়া হলে তাঁরা আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে পারেন।

ব্যবসায়িক সম্পদের ক্ষেত্রেও উত্তরাধিকার করের ছাড় কমানো হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি মূল্যের ব্যবসায়িক সম্পদের ওপর ২০ শতাংশ হারে উত্তরাধিকার কর দিতে হবে। এতে পারিবারিক ব্যবসাগুলো বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।

আইনি প্রতিষ্ঠান উইদার্সের অংশীদার ক্রিস গ্রোভস বলেন, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে যদি হঠাৎ তার মোট মূল্যের ২০ শতাংশ নগদ অর্থে পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেটি প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। করব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে তাঁদের উত্তরসূরিদের কর পরিশোধের অর্থ জোগাড় করতে ব্যবসার অংশবিশেষ, এমনকি পুরো ব্যবসাটিও বিক্রি করে দিতে হতে পারে।

ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, যুক্তরাজ্যকে ‘সম্পদ সৃষ্টির দেশ’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুরোনো নন-ডম ব্যবস্থা বাতিলের পর নতুন করব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর আওতায় যোগ্য নতুন করদাতারা প্রথম চার বছর বিদেশি আয় ও মুনাফার ওপর পুরো করছাড় পাবেন।

তবে কর পরামর্শকেরা মনে করছেন, চার বছরের এই সুবিধা যথেষ্ট নয়। তাঁদের কেউ কেউ এটি ১০ বছর করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি ইতালি ও গ্রিসের মতো নির্দিষ্ট হারে করব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও এসেছে। তাঁদের মতে, এমন সুবিধা চালু করা গেলে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাজ্যে আকৃষ্ট করা সহজ হবে।

এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, দেশটির করব্যবস্থা আরও কঠোর হলে তিনি ব্যবসা জুরিখে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখছেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুতই তা করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীও যুক্তরাজ্যের করব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই করের চাপ সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকগুলোর ওপর নতুন করে কর আরোপ করা হলে দেশটির আর্থিক খাতে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

বিশেষ করে লন্ডনের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের জন্য এ ধরনের করনীতি কতটা প্রতিযোগিতামূলক থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের এই পরিস্থিতিকে নিজেদের সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এসব দেশ করসুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

ইউরোপের বড় শহরগুলো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে করের সুবিধার সঙ্গে উন্নত জীবনযাপন, ব্যবসার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুবিধা যুক্ত করে ধনী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে।

সব মিলিয়ে উচ্চ কর, নীতির পরিবর্তন এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাজ্য তার ধনী করদাতা ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ধরে রাখতে কতটা সক্ষম হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে গ্রিস, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের করসুবিধা ধনীদের দেশ পরিবর্তনের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17272 ,   Print Date & Time: Sunday, 13 September 2026, 03:20:36 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh