
ইবি রিপোর্ট
উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে তাঁদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত উদ্যোক্তারা ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা হবে ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট রবিবার জারি করা সার্কুলারে ‘উদ্যোগ: উপজেলা-ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র নীতিমালা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তরুণ উদ্যোক্তাদের স্থানীয়ভাবে আয় উৎসারী, উৎপাদনমুখী ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মসূচির আওতায় প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক ধারণাকেও বিবেচনা করা হবে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপসহ বৈধ ব্যবসা এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। আইন দ্বারা নিষিদ্ধ কোনো ব্যবসা এ কর্মসূচির আওতায় আসবে না।
আবেদনকারীর বয়স আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বা ব্যবসার ধারণা থাকতে হবে অথবা নতুন ব্যবসা স্থাপনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। ব্যবসা পরিচালনা ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রস্তাবও যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তবে যোগ্যতার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঋণ নেওয়া থাকলে ওই আবেদনকারী এ কর্মসূচিতে বিবেচিত হবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি ব্যক্তিও আবেদন করতে পারবেন না। সিআইবি যাচাইয়ে খেলাপি প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল হবে। সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এ কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবেন না।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ২০ লাখ টাকা হলেও প্রত্যেক নির্বাচিত উদ্যোক্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ পরিমাণ পাবেন না। ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন, প্রস্তাবিত ব্যয় পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। ঋণ ও অনুদানের অনুপাত হবে ৫০:৫০। যেমন, কোনো ব্যবসায় ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পাওয়া যেতে পারে। উদ্যোক্তার নিজস্ব বিনিয়োগ বা অন্য বৈধ উৎসের অর্থ থাকলে সেটিও অর্থায়ন পরিকল্পনায় বিবেচনা করতে হবে।
নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংক। ব্যবসার ধরন ও খাত অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকেও সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে একই উদ্যোগের বিপরীতে একাধিক তহবিল থেকে পুনঃঅর্থায়ন নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট স্কিমের সুদ বা মুনাফার হার ও অন্যান্য শর্তও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
কর্মসূচির একটি বিশেষ দিক হলো, প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানত ছাড়াও অর্থায়ন করা যাবে। ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। ঋণ ও অনুদান একই সময়ে এককালীন এবং অনুমোদিত পূর্ণ পরিমাণে উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নগদে কোনো অর্থ দেওয়া যাবে না।
অনুদান পাওয়ার পর সেটি শর্তসাপেক্ষ। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বা অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ ঋণে রূপান্তরিত হবে। তখন ওই অর্থ সরকারি পাওনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদায়যোগ্য হবে।
আবেদন করা যাবে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায়। আবেদনকারীকে আগে থেকেই ওই ব্যাংকের হিসাবধারী হতে হবে না। আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং নির্ধারিত ফরম জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের নাগরিক সনদও দিতে হবে। আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৬।
আবেদনপত্রে শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, ব্যবসার বিস্তারিত পরিকল্পনাও দিতে হবে। ব্যবসার ধারণা, সম্ভাব্য ক্রেতা, ব্যবসা শুরুর সময়, ব্যবসার ধরন, সম্ভাব্য অবস্থান, পণ্যের ধরন, কাঁচামালের উৎস, বাজার, সম্ভাব্য বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ এবং প্রথম বছরে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসার সম্ভাব্য সমস্যা ও ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার পরিকল্পনাও জানাতে হবে।
বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনাকারী আবেদনকারীদের জন্য আলাদা তথ্য চাওয়া হয়েছে। ব্যবসার নাম ও ধরন, শুরুর তারিখ, ট্রেড লাইসেন্স, বিক্রয় ও মুনাফা, পরিচালন ব্যয়, উদ্যোক্তার সম্পৃক্ততা, বিনিয়োগ, বিপণন এলাকা, প্রতিযোগী, ব্যবসার ঝুঁকি, কর্মীর সংখ্যা এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা দিতে হবে।
উদ্যোক্তা বাছাই হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায়। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, তফসিলি ব্যাংকের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি সহযোগী সংস্থা, সংশ্লিষ্ট খাতের শিল্পনেতা, শিক্ষাবিদ এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ব্যবসার ধারণার যৌক্তিকতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা, বাজার সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে চূড়ান্ত নির্বাচন হবে।
আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকের শাখাকে নির্ধারিত ‘উদ্যোগ’ রেজিস্টার রাখতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যদিবসে তা উপজেলা লিড ব্যাংকের কাছে পাঠাতে হবে। এরপর আবেদন জেলা লিড ব্যাংকের কাছে পাঠানো হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কার্যালয়ে যাবে।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়া ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতিমালা এবং প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১৫ কার্যদিবসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ব্যাংককে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। ঋণের অর্থ অনুমোদিত ব্যয় পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও ব্যাংক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।
অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের ধারাবাহিক পরামর্শ, ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ ব্যবসা নিবন্ধনে সহায়তা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি এবং বাজারসংযোগের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা বা কোনো পর্যায়ে প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল এবং আবেদনকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। ঋণের অর্থ ব্যক্তিগত ভোগ, জমি বা যানবাহন কেনায় ব্যবহার না করার অঙ্গীকারও আবেদনপত্রে দিতে হবে। প্রতিটি ব্যয়ের ভাউচার সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবেদন দেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে।