
বিশেষ প্রতিনিধি
বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষের বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ঘরের ফ্যান থেমে যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাহত হয়, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে, শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, দায় কার?
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর উত্তর অনেক সময় খুব সহজ করে দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় আছে, মন্ত্রী আছেন—অতএব সমস্যার দায়ও তাঁর। কিন্তু বিদ্যুতের মতো একটি জটিল ও বহুস্তরীয় খাতের ক্ষেত্রে এই সরল সমীকরণ কতটা যৌক্তিক?
সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে কিছু তীর্যক মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। সংসদে সমালোচনা হবে, প্রশ্ন হবে, জবাবদিহি চাইবে—এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক সৌন্দর্য। কিন্তু সমালোচনা যখন সমস্যার কারণ অনুসন্ধানের বদলে ব্যক্তির দিকে গিয়ে স্থির হয়, তখন মূল সংকটটি আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে তাই প্রশ্নটি একটু অন্যভাবে করা দরকার। দেশে বিদ্যুৎ কেন যায়? উৎপাদন কম বলে? জ্বালানির অভাব আছে বলে? নাকি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কারণেও?
সম্ভবত উত্তরটি একক কোনো কারণে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থার দিকে তাকানো দরকার
একজন মন্ত্রী অবশ্যই তাঁর মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বহন করেন। ব্যর্থতা থাকলে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হবে। কিন্তু একজন মন্ত্রী কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করেন না, প্রতিটি ফিডারের ত্রুটি শনাক্ত করেন না কিংবা দূরবর্তী গ্রামের ট্রান্সফরমার নিজে গিয়ে মেরামত করেন না।
বিদ্যুৎ একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন, বিতরণ, উপকেন্দ্র, ফিডার, ট্রান্সফরমার, জনবল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি—সবকিছু মিলেই এর কার্যকারিতা নির্ধারিত হয়।
এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। তবে একটি খাতের বহু বছরের অবকাঠামোগত দুর্বলতা নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যে পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সমস্যার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুতরাং দায় নির্ধারণ করতে হলে সময়ের ধারাবাহিকতাও দেখতে হবে।
পল্লী বিদ্যুতের সংকট কেন আলাদা
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিজ্ঞতা শহরের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। এর অন্যতম কারণ দীর্ঘ ওভারহেড লাইন ও ফিডার।
অনেক এলাকায় একটি ফিডারকে কয়েক দশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। কোনো কোনো ফিডারের দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৬০ কিলোমিটার, এমনকি তারও বেশি হতে পারে। এই দীর্ঘ লাইনের কোথাও গাছের ডাল পড়লে, ইনসুলেটর নষ্ট হলে কিংবা শর্ট সার্কিট হলে পুরো এলাকায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সমস্যা শুধু ত্রুটি হওয়া নয়। ত্রুটিটি কোথায় হয়েছে, সেটি খুঁজে বের করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
শহরের একটি সীমিত এলাকায় সমস্যা শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুৎলাইনের ক্ষেত্রে লাইনম্যানদের অনেক সময় পুরো পথ পরিদর্শন করতে হয়। গাছের ডাল সরানো, ইনসুলেটর পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি মেরামতের পর আবার লাইন চালু করা হয়।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সব ক্ষেত্রে একটি সুইচ টিপে সরবরাহ ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না।
এই বাস্তবতা না বুঝে প্রতিটি লোডশেডিংয়ের জন্য শুধু একজন মন্ত্রীকে দায়ী করলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হয় না।
দীর্ঘ লাইনের যত সমস্যা
গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বিদ্যুৎলাইন খোলা পরিবেশের মধ্য দিয়ে গেছে। গাছপালা, কৃষিজমি, নদী কিংবা বিস্তীর্ণ জনপদের ওপর দিয়ে এসব লাইন চলেছে। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত ও প্রবল বাতাসের প্রভাব তাই সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহে পড়ে। গাছের ডাল লাইনের সঙ্গে স্পর্শ করলে শর্ট সার্কিট হতে পারে। বৈরী আবহাওয়ায় ইনসুলেটর, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘ ফিডারের আরেকটি সমস্যা ভোল্টেজ ড্রপ। উপকেন্দ্র থেকে সরবরাহের দূরত্ব যত বাড়ে, লাইনের শেষ প্রান্তে ভোল্টেজ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে। অতিরিক্ত চাপের সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
অনেক এলাকায় আধুনিক অটোমেটিক প্রোটেকশন ও রিক্লোজিং ব্যবস্থার ঘাটতিও রয়েছে। ফলে ছোট একটি ত্রুটি পুরো ফিডার বন্ধ করে দিতে পারে। একটি স্থানীয় সমস্যা তখন বড় এলাকার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পরিণত হয়।
এগুলো কোনো এক দিনের সমস্যা নয়। বছরের পর বছর অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের যে সমন্বয় প্রয়োজন ছিল, সেখানে ঘাটতি থাকলে তার ফল একসময় জনগণকেই ভোগ করতে হয়।
চাহিদা বেড়েছে, সক্ষমতা কি সেই গতিতে বেড়েছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। কৃষিতে সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে।
কিন্তু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা একই গতিতে বাড়ানো হয়েছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
কোনো ট্রান্সফরমারের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি লোড হলে সেটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার নষ্ট হলে দ্রুত বিকল্প যন্ত্রপাতি পৌঁছানোও সব সময় সহজ নয়।
স্পেয়ার পার্টসের মজুত, পরিবহনব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবলের উপস্থিতি এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রশ্নটি শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের ঘরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছানোর সক্ষমতাও সমান জরুরি।
জাতীয় সংকটের প্রভাবও আছে
পল্লী বিদ্যুতের সমস্যা শুধু স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হলে কিংবা উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। একই সময়ে রাজধানী, শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য অগ্রাধিকারভিত্তিক এলাকায় সরবরাহ বজায় রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের প্রভাব অন্য এলাকার ওপরও পড়ে।
এ কারণে কোনো গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকলে তার কারণ শুধু স্থানীয় ফিডারের ত্রুটি নাও হতে পারে। জাতীয় গ্রিডের পরিস্থিতি, উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ ও সঞ্চালনব্যবস্থার অবস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
এই জটিল বাস্তবতাকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
আর এখানেই ব্যক্তি ও ব্যবস্থার দায় আলাদা করে দেখার প্রয়োজন।
সংসদে বিতর্ক হোক, সমাধানের জন্য
সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে কঠিন প্রশ্ন করা হোক। কেন বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কতক্ষণ যাচ্ছে, কোন এলাকায় বেশি যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতেই হবে।
কিন্তু প্রশ্ন করার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিদ্রূপের পার্থক্য রয়েছে।
একজন মন্ত্রীর বক্তব্য ভুল হলে সেটি নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। তাঁর সিদ্ধান্তে ব্যর্থতা থাকলে তারও জবাবদিহি চাইতে হবে। কিন্তু একটি কাঠামোগত সমস্যার সব দায় তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দিলে নীতিগত আলোচনার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে যায়।
তখন প্রশ্ন ওঠে না, কেন দীর্ঘ ফিডার কমানো যাচ্ছে না। আধুনিক ফল্ট লোকেটর কোথায়। পর্যাপ্ত স্পেয়ার যন্ত্রপাতি আছে কি না। জনবল যথেষ্ট কি না। স্মার্ট গ্রিডের অগ্রগতি কত দূর।
সমালোচনার উদ্দেশ্য যদি সমাধান হয়, তাহলে আলোচনার কেন্দ্রেও সমাধানকে রাখতে হবে।
সমাধান কোথায়
পল্লী বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের পাশাপাশি বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
দীর্ঘ ফিডারের সমস্যা কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন উপকেন্দ্র ও সাবস্টেশন নির্মাণ করা যেতে পারে। আধুনিক স্মার্ট গ্রিড, অটোমেটিক রিক্লোজার ও ফল্ট লোকেটর ব্যবহারের মাধ্যমে ত্রুটির স্থান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
এতে লাইনম্যানদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যানুয়াল পেট্রোলিংয়ের প্রয়োজন কমবে।
প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার, ইনসুলেটর, ফিউজসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে রিজার্ভ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে জরুরি যন্ত্রপাতি দ্রুত পৌঁছানো যায়।
একই সঙ্গে গ্রাহকসংখ্যা ও ফিডারের দৈর্ঘ্য বিবেচনায় জনবল বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও দক্ষ মানুষ ছাড়া বিদ্যুৎব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদের বাইরে গিয়ে জাতীয় ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
দায়বণ্টনের চেয়ে সমাধান জরুরি
বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে না—এমন কোনো কথা নেই। বরং ক্ষমতায় থাকার অর্থই হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। বিদ্যুৎমন্ত্রীও তাঁর দায়িত্বের বাইরে নন। তবে এটিও সত্য, সব সমস্যার জন্ম এক দিনে হয় না। আর সব সমস্যার সমাধানও এক দিনে সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ খাতের সংকট যদি দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, জ্বালানি সমস্যা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটির সমষ্টি হয়, তাহলে তার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
একজন মন্ত্রীকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু একটি জটিল ব্যবস্থাকে সংস্কার করা কঠিন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন সেই কঠিন কাজটির সামনে দাঁড়িয়ে। প্রয়োজন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কারিগরি বিশ্লেষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
বিদ্যুৎ চলে গেলে ক্ষুব্ধ মানুষ উত্তর চাইবেন। সেই উত্তরও দিতে হবে সরকারকে। কিন্তু উত্তরটি যদি শুধু একজন মানুষের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে যাবে আগের জায়গাতেই।
ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেয়ে তাই এখন বেশি জরুরি পুরো ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। কারণ বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান কোনো বক্তৃতায় নয়, টেকসই অবকাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কারেই নিহিত।