• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে | সারাদেশ > পার্ক বানালেই হবে না, উদ্যোক্তা ও শিল্প বিকাশে কার্যকর সংযোগ চান বিশেষজ্ঞরা

পার্ক বানালেই হবে না, উদ্যোক্তা ও শিল্প বিকাশে কার্যকর সংযোগ চান বিশেষজ্ঞরা

  • রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৫
  • ১১

---

 

ইবি রিপোর্ট

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথাযথভাবে যাচাই না করেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক নীতিনির্ধারক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এসব পার্কে বিপুল অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামো গড়ে উঠলেও উদ্যোক্তা বিকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো প্রয়োজনীয় কার্যকর ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠেনি। ফলে নির্মিত অবকাঠামোগুলো প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল দিতে পারছে না।

গতকাল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘হাই-টেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম রকনুজ্জামান; ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারহানা এ রহমান; ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফেল কবির; যশোর হাই-টেক পার্কে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অংশ ইন্টারন্যাশনালের এমডি মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম এবং হাই-টেক পার্ক রাজশাহীর নেট্রো সিস্টেমস লিমিটেড ও টেলজেনের সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির।

আলোচনায় হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, হাই-টেক পার্কের লক্ষ্য ও মিশন নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা সেখানে শুধু জায়গা ভাড়া নেবেন, নাকি তাদের ব্যবসা গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া হবে—তা স্পষ্ট করা জরুরি।

তিনি বলেন, হাই-টেকের ধারণাকে শুধু সফটওয়্যার খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ও ব্যবসার বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তার মতে, হাই-টেক পার্কের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু কতটি প্রতিষ্ঠান পার্কে জায়গা নিয়েছে, সেটিকে সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং সফল কোম্পানি তৈরি এবং সেগুলোর বিকাশ কতটা হচ্ছে, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক, প্রশিক্ষণদাতা ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে বিদ্যমান দুর্বল সংযোগ দূর করার ওপরও জোর দেন।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামো ব্যবহার হচ্ছে না। তাই বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা দরকার।

ইউওয়াই সিস্টেমসের চেয়ারপারসন ও সিইও ফারহানা এ রহমান বলেন, অসংখ্য হাই-টেক পার্ক তৈরির পরিবর্তে একটি বা কয়েকটি পার্ককে দৃশ্যমান ও কার্যকর করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা গেলে প্রযুক্তি শিল্পের ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী হবে এবং বাজারে আস্থাও বাড়বে।

অন্যদিকে, এনএসইউর অধ্যাপক ড. এম রকনুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে হাই-টেক পার্ক তৈরির ক্ষেত্রে এমন একটি ব্যবস্থার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে অবকাঠামো, যোগাযোগ, ইউটিলিটি, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং নীতি-প্রণোদনা একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। গবেষণা, দক্ষতা, শিল্প ও নীতির মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। তাহলেই প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

ডিএনএস সফটওয়্যারের এমডি রফেল কবির মনে করেন, সঠিক নীতিসহায়তা থাকলে হাই-টেক পার্ক দেশের প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

তবে বর্তমানে নির্মিত বিপুলসংখ্যক অবকাঠামো কীভাবে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অংশ ইন্টারন্যাশনালের এমডি মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, হাই-টেক পার্কের সাফল্য শুধু সেখানে কতটি প্রতিষ্ঠান জায়গা নিয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়।

একটি প্রতিষ্ঠান ১০ জন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করার পর সেটি ১০০ বা এক হাজার কর্মীতে উন্নীত হতে পারছে কি না, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারছে কি না এবং গবেষণা ও উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় দিয়ে সাফল্য মূল্যায়ন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এ ছাড়া পার্ক কর্তৃপক্ষ একটি প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নিতে কী ধরনের সহায়তা করেছে, সেটিও সাফল্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হাই-টেক পার্কে স্টার্টআপ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নেট্রো সিস্টেমস ও টেলজেনের সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির।

তিনি বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে নতুন উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা শুরু এবং তা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন।

আলোচনায় সামগ্রিকভাবে উঠে আসে, হাই-টেক পার্কের সাফল্য কেবল ভবন, জমি বা অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষ জনবল উন্নয়ন, গবেষণা, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, অর্থায়ন, নীতি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ—সবকিছুর সমন্বিত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই এসব পার্ক থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

ফলে ইতোমধ্যে নির্মিত অবকাঠামোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস এবং সীমিতসংখ্যক পার্ককে কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17212 ,   Print Date & Time: Sunday, 13 September 2026, 05:49:57 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh