
ইবি রিপোর্ট
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ছাড়া দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করা কঠিন। প্রায় প্রতিটি বাসা, অফিস কিংবা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে রাউটার। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশনসহ নানা ধরনের ডিভাইস ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত রাখতে রাউটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এই রাউটারই যথাযথভাবে সুরক্ষিত না থাকলে হয়ে উঠতে পারে সাইবার নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা।
বেশিরভাগ মানুষ নতুন রাউটার নেওয়ার পর প্রথমেই ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করেন। এরপর ফোন, কম্পিউটার বা টেলিভিশনে ইন্টারনেট ঠিকঠাক চলতে শুরু করলেই বিষয়টি নিয়ে আর তেমন ভাবেন না। কিন্তু শুধু ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করলেই রাউটার পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যায় না। এর পাশাপাশি রাউটারের অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাউটারের অ্যাডমিন পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে এর অ্যাডমিন প্যানেলে প্রবেশ করা যায়। এই প্যানেল থেকেই ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কসহ রাউটারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেটিংস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে কেউ যদি অ্যাডমিন প্যানেলে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে পুরো নেটওয়ার্কের নিরাপত্তাই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
ব্রডব্যান্ড জিনির এক জরিপে দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ মানুষ কখনোই তাদের রাউটারের ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করেননি। নিরাপত্তার দিক থেকে এটি উদ্বেগের বিষয়।
অনেক রাউটারের ডিফল্ট ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড খুব সহজেই অনুমান করা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাউটারের নিচে বা পেছনের স্টিকারেও এসব তথ্য লেখা থাকে। ফলে কেউ যদি রাউটারের মডেল শনাক্ত করতে পারে, তাহলে ডিফল্ট লগইন তথ্য ব্যবহার করে অ্যাডমিন প্যানেলে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।
রাউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারলে সাইবার অপরাধীরা শুধু ইন্টারনেট সংযোগের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে না, বরং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইসকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
যেমন, রাউটারের সঙ্গে সংযুক্ত ক্যামেরা, স্মার্ট স্পিকার কিংবা অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। এমনকি ব্যবহারকারীকে আসল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকিং তথ্য, লগইন তথ্য বা পাসওয়ার্ড চুরির চেষ্টাও করা সম্ভব।
এ ছাড়া হ্যাকাররা ‘ম্যান-ইন-দ্য-মিডল’ ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আক্রান্ত রাউটারকে আবার বটনেটের অংশ বানিয়ে ডিডস (DDoS) হামলার মতো সাইবার আক্রমণেও ব্যবহার করা সম্ভব।
রাউটারের অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। প্রথমে রাউটারের আইপি ঠিকানা খুঁজে বের করতে হবে। এরপর ফোন বা কম্পিউটারের ব্রাউজারে সেই আইপি ঠিকানা লিখে রাউটারের অ্যাডমিন প্যানেলে প্রবেশ করা যায়।
সাধারণত ১৯২.১৬৮.১.১ বা ১৯২.১৬৮.০.১ ধরনের আইপি ঠিকানা রাউটারে ব্যবহৃত হয়। অ্যাডমিন প্যানেলে প্রবেশের পর নিরাপত্তা বা পাসওয়ার্ড সংক্রান্ত সেটিংস থেকে নতুন অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড নির্ধারণ করা যায়।
নতুন পাসওয়ার্ড তৈরির ক্ষেত্রে বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং যতিচিহ্নের সমন্বয় ব্যবহার করা ভালো। একই সঙ্গে সহজে অনুমান করা যায় এমন শব্দ বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
বিশেষ করে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তারিখ সরাসরি পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এসব তথ্য অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে কোনো বিশেষ তারিখকে সরাসরি ব্যবহার না করে তার সঙ্গে বিভিন্ন সংখ্যা, অক্ষর ও প্রতীক যোগ করে তুলনামূলক শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করা যেতে পারে।
রাউটারের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পরপর অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা যেতে পারে। সাধারণভাবে ৩০ থেকে ৯০ দিন পরপর পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব।
এর পাশাপাশি রাউটারের কার্যক্রমের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। রাউটারে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, অপরিচিত ডিভাইস নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে কি না কিংবা ইন্টারনেটের গতি অকারণে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে কি না—এসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
বিশেষ করে অনেক পুরোনো মডেলের রাউটার ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ পুরোনো ডিভাইসে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দুর্বলতা থাকার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
হঠাৎ কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই রাউটার ধীরগতিতে কাজ করলে বিষয়টি অবহেলা না করে সম্ভাব্য কারণ খুঁজে দেখা উচিত। কোনো কারণ খুঁজে না পাওয়া গেলে সতর্কতার অংশ হিসেবে অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাও একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে।
ডিজিটাল নির্ভরতা যত বাড়ছে, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের নিরাপত্তাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই শুধু ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করেই দায়িত্ব শেষ না করে রাউটারের অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড, ডিভাইসের কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা সেটিংসের প্রতিও নিয়মিত নজর রাখা জরুরি। সচেতনতাই পারে ঘরের ইন্টারনেট নেটওয়ার্ককে সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে।