• হোম > অর্থনীতি > আট দশকের পুরোনো আমদানি-রপ্তানি আইন পর্যালোচনা করছে সরকার

আট দশকের পুরোনো আমদানি-রপ্তানি আইন পর্যালোচনা করছে সরকার

  • শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৪
  • ১৪

---

 

ইবি রিপোর্ট

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন), বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন), ভ্যাট ও কাস্টমস নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এর পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির জন্য আলাদাভাবে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমান ডিজিটাল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে এসব অতিরিক্ত সনদ ও নবায়ন প্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছে। তাদের মতে, ব্যবসায়ীর পরিচয়, কর ও লেনদেনের তথ্য সরকারের কাছে নিশ্চিত করার জন্য ইতোমধ্যে টিআইএন, বিআইএন, কাস্টমস ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ একাধিক কার্যকর কাঠামো রয়েছে।

আইআরসি ও ইআরসি ব্যবস্থার শিকড় প্রায় আট দশক আগের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়লে যুদ্ধ সরঞ্জাম ও জরুরি পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ১৯৩৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ‘ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া রুলস’ বা ভারত প্রতিরক্ষা বিধি জারি করেছিল।

দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে ওই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা হয়। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করে।

প্রায় আট দশক পরও বাংলাদেশে সেই পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বড় একটি অংশ বহাল রয়েছে। ওই আইনের আওতায় এখনও ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে আইআরসি ও ইআরসি নিতে হয়।

আগে এসব সনদ প্রতিবছর নবায়ন করতে হলেও বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়নের সুযোগ রয়েছে। ঢাকায় আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের পাশাপাশি সারা দেশে মোট ১৪টি আঞ্চলিক দপ্তর থেকে এসব সনদ ইস্যু ও নবায়নের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছিল, সেই পাকিস্তানই ২০০২ সালে আইনটি বাতিল করেছে। ফলে দেশটির ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে প্রচলিত আইআরসি-ইআরসির মতো পৃথক সনদ নিতে হয় না। সেখানে কাস্টমসের ওয়েবভিত্তিক ট্রেডার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আইআরসি ও ইআরসি গ্রহণ এবং নিয়মিত নবায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খানও এসব সনদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে আইনের আওতায় আমদানি-রপ্তানি সনদ ইস্যু করা হয়, সেই আইন পাকিস্তান দুই যুগ আগেই বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের কোনো সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ভারতে একবার স্থায়ীভাবে সনদ নিতে হয়, পরে তা নবায়নের প্রয়োজন হয় না।

তার মতে, বাংলাদেশে ডিরেগুলেশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই আইআরসি ও ইআরসি নেওয়া ও নবায়নের পরিবর্তে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমেই আমদানি-রপ্তানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের এক গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে অন্তত ৪৯ ধরনের সনদ ও অনুমতিপত্র নিতে হয়।

আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য আমদানির জন্য আইআরসি ফি শুরু হয় ৫ হাজার টাকা থেকে। এর নবায়ন ফি ৩ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ক্যাটাগরিতে আইআরসি ফি বেড়ে ৮০ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।

রপ্তানিকারকদের জন্য রয়েছে ছয় ধরনের নিবন্ধন সনদ। প্রতিটির প্রাথমিক ফি শুরু হয় ১০ হাজার টাকা থেকে এবং নবায়ন ফি ৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে ইনডেনটিং সেবার ইআরসি নিতে ফি ৫০ হাজার টাকা এবং নবায়নের জন্য ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, সমস্যা শুধু সনদ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব সনদ নবায়নের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং তৈরি হয় বাড়তি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব কমপ্লায়েন্স ও প্রশাসনিক টিম রাখতে পারলেও ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হয়। ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির প্রকৃত ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত প্রশাসনিক খরচও তৈরি হয়।

এশিয়ার অনেক বড় ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতে বাংলাদেশের মতো পৃথক আইআরসি-ইআরসি সনদের ব্যবস্থা নেই। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক চীনেও বাংলাদেশের মতো আলাদা আমদানি ও রপ্তানি সনদের প্রয়োজন হয় না। কাস্টমস নিবন্ধনের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত হতে পারেন।

ভিয়েতনামেও সাধারণ পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পৃথক সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের মতো আলাদা আইআরসি-ইআরসি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে আইআরসি ও ইআরসি সনদের প্রয়োজনীয়তা নেই।

তিনি বলেন, ব্যবসা-বিনিয়োগ ও দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ডিরেগুলেশনে জোর দিতে হবে এবং বিশ্বের সেরা চর্চাগুলো অনুসরণ করতে হবে। অন্তত আঞ্চলিক দেশগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাগুলো অনুসরণ করাও জরুরি।

ফজলুল হকের মতে, বাংলাদেশে কোন কোন পণ্য আমদানি করা যাবে না এবং কোন পণ্য আমদানি করতে হলে সরকারের কোন দপ্তরের অনুমোদন নিতে হবে, তা আমদানি নীতি আদেশে উল্লেখ রয়েছে। কাস্টমসের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমদানি করতে হয়। তাই আমদানির জন্য পৃথক সনদ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই।

একইভাবে, কোন পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ তার তালিকা রপ্তানি নীতি আদেশে রয়েছে। তার মতে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করতে পারে। ফলে পৃথকভাবে রপ্তানি সনদ নেওয়া কিংবা আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আইআরসি ও ইআরসি ব্যবস্থা এমন সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস প্রক্রিয়া, ব্যাংকিং নজরদারি এবং কর ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীদের পরিচয় ও লেনদেন সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য সংগ্রহের আরও কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে।

এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, আইআরসি ও ইআরসি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হলে ব্যবসায়ী ও সরকার—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।

তার মতে, ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাবেন। একই সঙ্গে এসব সনদ ইস্যু ও নবায়নের জন্য সরকারের যে বড় প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করতে হচ্ছে, তার প্রয়োজনীয়তাও কমবে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে সরকার ডিরেগুলেশনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করা যায়, তা পর্যালোচনা করছে।

বাণিজ্য সচিব জানান, ১৯৫০ সালের আমদানি-রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে। প্রথম ধাপে এই আইনের অধীনে যেসব সনদ নিতে হয়, সেগুলোর মধ্যে কোনগুলো বর্তমানে আর প্রয়োজন নেই, তা খতিয়ে দেখা হবে। অপ্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা থাকলে সেগুলো তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, যদি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে আইনটিরই আর প্রয়োজন নেই, তাহলে সরকার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করবে। আর আইনটি প্রয়োজনীয় মনে হলে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা সংশোধন ও সহজ করা হবে।

ফলে দীর্ঘদিনের আইআরসি-ইআরসি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরা চাইছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রশাসনিক ধাপ কমিয়ে একটি সহজ, ডিজিটাল ও ব্যবসাবান্ধব ব্যবস্থা চালু করা হোক।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17149 ,   Print Date & Time: Sunday, 13 September 2026, 09:31:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh