
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের বিস্তারের মধ্যে আকাশ হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশটি জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা হয়। এর পরদিন পাইপলাইনটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে হামলার জন্য কারা দায়ী, তা স্পষ্ট হয়নি।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে। এই পরিমাণ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় তেল পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইন বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। তবে হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে, ইরাক থেকে ড্রোন হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল। ইরাকে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। হামলার পর ইরাক সরকার একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া সামরিক কমান্ডার মায়সান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ইরানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের তৎপরতা ও প্রভাবের এলাকা হিসেবে পরিচিত।
ইরাক সরকারের নিন্দার পাশাপাশি সৌদি আরবও হামলার জবাবে তাৎক্ষণিক কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার মধ্যেই সৌদির পাইপলাইনে হামলার ঘটনা ঘটল। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট—দুই দিক থেকেই আরব উপদ্বীপের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ গতকাল হুথিরা দখল করে নিয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে থাকার মধ্যে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং পেরিম দ্বীপ দখলের খবর পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) শুক্রবার জানিয়েছে, সৌদি আরবের জ্বালানি তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলাকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরাকের শালামচেহ সীমান্ত পারাপারও বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এই সীমান্ত।
হুথিরা যদি বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইয়েমেন সরকারের বাহিনী জানিয়েছে, হুথিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকা হুথি যোদ্ধারা চলতি সপ্তাহে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
ইরানের দুটি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহে তেহরান হুথিদের সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সহায়তার জন্য আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে ইরান হুথিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রকাশ্যে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, হুথিরা ‘ইরানের প্রক্সি নয়’।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ রয়েছে। সৌদি জাহাজের ওপর আগে ঘোষণা করা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলেও জানান তিনি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অন্তত দুবার ফোন করেছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে। এর আগে অ্যাক্সিওসও একই তথ্য প্রকাশ করেছিল।
সূত্রগুলোর দাবি, ওয়াশিংটন আপাতত রিয়াদের হয়ে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে কি না—রয়টার্সের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন, বাব আল-মানদেব ঘিরে হুথিদের তৎপরতা এবং সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।