
ইবি রিপোর্ট
ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে আরও ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ১৫তম ‘এলএনজি প্রডিউসার-কনজিউমার কনফারেন্স ২০২৬’-এ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশল তুলে ধরার সময় এসব পরিকল্পনার কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
‘অ্যাডভান্সিং এলএনজি ফর দ্য ফিউচার: রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিলায়েবিলিটি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশে বছরে প্রায় ৭ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ) এলএনজির চাহিদা রয়েছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশে গ্যাসের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন করা হবে। নতুন এই টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে।
এর পরবর্তী ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, মহেশখালী ও মাতারবাড়ীর দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে এলএনজি গ্রহণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মোকাবিলায় সরবরাহ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
শুধু ২০৩০ সাল পর্যন্ত নয়, দীর্ঘমেয়াদেও এলএনজি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদে দেশে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ এমটিপিএ এলএনজি সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে।
পরবর্তী ২০৩১ থেকে ২০৪০ সাল মেয়াদে এই সক্ষমতা ১৭ থেকে ১৮ এমটিপিএতে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এলএনজি সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন উৎস ও ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার-টু-গভর্নমেন্ট (জিটুজি), আন্তর্জাতিক দরপত্র এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) ব্যবহার করে বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বা সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেও দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজে বের করার উদ্যোগও জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ ঘোষণা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই বিডিং রাউন্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে মুনাফা স্থানান্তর, কর পরিশোধে সরকারি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব স্থিতিশীলতার মতো বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
সরকারের প্রত্যাশা, দেশের সমুদ্রসীমায় নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কার করা সম্ভব হলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো যাবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়লে জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান—এই তিনটি উদ্যোগকে সামনে রেখে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।