• হোম > অর্থনীতি | জাতীয় | দেশজুড়ে > বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানিতে রেকর্ড, এক বছরে আয় বাড়ল ২৩.৮২ শতাংশ

বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানিতে রেকর্ড, এক বছরে আয় বাড়ল ২৩.৮২ শতাংশ

  • শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৭
  • ১২

---

 

ইবি রিপোর্ট

দেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানিতে গতি এসেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২০ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৬ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রকৌশল পণ্যের মধ্যে বৈদ্যুতিক পণ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছে। একই সময়ে বাইসাইকেল রপ্তানি ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৫ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এতে দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানিতে যখন ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে উৎপাদকদের সামনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে।

ইইউ টেকসই উৎপাদন, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, স্থায়িত্ব ও মেরামতযোগ্যতার মতো বিষয়ে ক্রমেই কঠোর শর্ত আরোপ করছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন (ইএসপিআর) কার্যকর হয়।

এই কাঠামোর আওতায় ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) এবং পণ্যের স্থায়িত্বসংক্রান্ত বিভিন্ন শর্ত চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিক্রি না হওয়া নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ধ্বংসের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

তবে ইএসপিআর কার্যকর হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক হয়েছে। পণ্যের ধরন অনুযায়ী ধাপে ধাপে ডেলিগেটেড অ্যাক্টের মাধ্যমে বিভিন্ন শর্ত কার্যকর করা হচ্ছে।

যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সেসব পণ্যের উপকরণ, যন্ত্রাংশ, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, স্থায়িত্ব ও মেরামতযোগ্যতাসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে হবে উৎপাদকদের।

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেমা) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, নতুন শর্ত মোকাবিলায় সদস্যদের প্রস্তুত করতে পণ্যের উৎস, ওয়ারেন্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা, মেরামতযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পণ্যের উৎস, ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবার পাশাপাশি পণ্য মেরামতযোগ্য কি না, এসব বিষয় নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।

তবে এই খাতে পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা বাজারের মান অনুযায়ী বৈদ্যুতিক পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা গড়ে তুলতে বেমা একাধিকবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে।

মোহাম্মদ আলীর মতে, বৈদ্যুতিক খাতের জন্য একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব ছোট উৎপাদক রপ্তানি বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য এমন একটি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস শনাক্ত করা বা ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা।

দেশের অনেক উৎপাদক চীন ও ভিয়েতনাম থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানি করেন। ফলে এসব উপকরণের উৎস, পরিবেশগত প্রভাব এবং কার্বন ফুটপ্রিন্টের তথ্য সংরক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে।

মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের বেশিরভাগ কাঁচামাল চীন বা ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা হয়। ফলে এসব পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট শনাক্ত করা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, যেসব বেমা সদস্য এতদিন মূলত দেশের বাজারকেন্দ্রিক ছিলেন, তারা রপ্তানিমুখী হতে গিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক ওয়ালটনের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত মানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো নতুন কোনো বিষয় নয় বলে জানিয়েছেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আল ইমরান।

তিনি জানান, বিদেশি বাজারের শর্ত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করেছে। এর মধ্যে ম্যানুয়াল নিবন্ধন থেকে ডিজিটাল রেজিস্টার্ড এক্সপোর্টার (রেক্স) ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং ইউরোপে জ্বালানি-দক্ষতার রেটিং পদ্ধতির পরিবর্তন রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে এ+++ রেটিং পরিবর্তন করে এ, বি, সি, ডি ও ই করা হলে ওয়ালটন দ্রুত নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করে।

দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে ওয়ালটনের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে অনেক যন্ত্রাংশ ও কম্পোনেন্ট তৈরি করে।

এ ছাড়া ওয়ালটনের নুসড্যাট-ইউটিএস পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার সুবিধা রয়েছে। আগে রেফ্রিজারেটর পরীক্ষার জন্য ভারতে পণ্য পাঠাতে হলেও বর্তমানে ওই পরীক্ষাগারের পরীক্ষার প্রতিবেদন ভারতের সংশ্লিষ্ট স্টার রেটিং প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হয়। ফলে পরীক্ষার জন্য পণ্য বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন হচ্ছে না।

নতুন কোনো শর্ত এলে নুসড্যাট-ইউটিএস ও অংশীদার পরীক্ষাগারের সঙ্গে কাজ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন চিহ্নিত করে দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভিশন ইলেকট্রনিকসও ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ওশেনিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে ইউরোপকে দেখছে তারা।

ইউরোপের মান, নিরাপত্তা ও ইকোডিজাইনসংক্রান্ত শর্ত পূরণে রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারের নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের জন্য প্রতিষ্ঠানটির এয়ার কন্ডিশনার ইতোমধ্যে জি-মার্ক সনদ পেয়েছে।

কাঁচামালের উৎস, রাসায়নিক মান পরিপালন এবং বিভিন্ন সাব-অ্যাসেম্বলি ব্যাচ শনাক্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি ইআরপি ব্যবস্থা সমন্বিত করছে। একই সঙ্গে বিল অব ম্যাটেরিয়ালস ডিজিটাল করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জ ও ডাঙ্গা শিল্পপার্কে স্কোপ ১, ২ ও ৩ কার্বন নিঃসরণ পরিমাপেও পরামর্শকদের সঙ্গে কাজ করছে ভিশন।

পণ্যের মেরামত ও যন্ত্রাংশ বদল সহজ করতে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) দল মডিউলার পিসিবি ডিজাইন এবং সহজে খোলা যায় এমন কম্প্রেসর ও ফ্যান-মোটর মাউন্ট ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে।

এ ছাড়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এমন কিছু কম্পোজিট প্লাস্টিকের পরিবর্তে এবিএস ও এইচআইপিএসের মতো একক ধরনের পলিমার ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশ দীর্ঘমেয়াদে সহজলভ্য রাখার বিষয়েও পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকারের শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করে বেমা।

মোহাম্মদ আলী বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মতো বৈদ্যুতিক খাতেও প্রণোদনা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা এবং আমদানি করা কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, সরকার এ ধরনের সহায়তা দিলে আগামী ১০ বছরে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস খাত দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে, এমনকি তৈরি পোশাক খাতের চেয়েও বেশি সম্ভাবনাময় হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বাণিজ্য, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদকদের সঙ্গে খাতভিত্তিক আলোচনা আয়োজনেরও আহ্বান জানান।

সামনে ব্যাটারি পাসপোর্টের নতুন শর্ত

এরই মধ্যে ব্যাটারি নিয়ে ইইউর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমাও সামনে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাটারি রেগুলেশন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইইউ বাজারে বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, ২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্প ব্যাটারি এবং হালকা যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারির জন্য ইলেকট্রনিক ব্যাটারি পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক হবে।

ফলে বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন শুধু প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন নয়। পণ্যটি কীভাবে তৈরি, কোন উপকরণ দিয়ে উৎপাদন, কোথা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ, কীভাবে পরীক্ষা ও মেরামত করা হয়—এসব তথ্যের প্রমাণ রাখার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি রপ্তানি করছে। পাশাপাশি পাওয়ার ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক কেবল ও ইনসুলেটেড তার, সুইচ, সকেট, সার্কিট ব্রেকার এবং এলইডি লাইটিং পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে।

এ ছাড়া রিচার্জেবল ব্যাটারি, ট্রানজিস্টর ও সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইসের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বাইসাইকেল ও অন্যান্য হালকা প্রকৌশল পণ্যও রপ্তানি তালিকায় রয়েছে।

বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি যখন দুই অঙ্কের হারে বাড়ছে, তখন মান পরিপালন, ট্রেসেবিলিটি, পরীক্ষা ও মেরামতযোগ্যতার সক্ষমতা যারা দ্রুত গড়ে তুলতে পারবে, বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরিতে তারাই তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/17105 ,   Print Date & Time: Sunday, 13 September 2026, 04:13:59 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh