
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। দেশটিতে ডিজেলের দাম নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে কয়েকটি জ্বালানি স্টেশনে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এমনকি অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কিছু স্টেশনের ডিজিটাল পাম্পে জ্বালানির সঠিক দাম প্রদর্শন করাও সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানির দাম পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম গ্যাসবাডির পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক ডি হান জানিয়েছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার পাঁচটি জ্বালানি স্টেশনে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৯ দশমিক ৯৯৯ ডলারে উঠেছে।
ডি হানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব স্টেশনের ডিজিটাল মূল্য প্রদর্শন বোর্ডে সর্বোচ্চ চারটি সংখ্যা দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ৯ দশমিক ৯৯৯ ডলারের বেশি দাম হলে সেটি বোর্ডে সঠিকভাবে প্রদর্শন করা সম্ভব নয়।
গ্যাসবাডির সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। তবে ডি হানের প্রকাশিত তথ্যে কোন শহরের কোন নির্দিষ্ট জ্বালানি স্টেশনে এই দাম নেওয়া হচ্ছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। তিনি প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট মূল্যের একটি স্ক্রিনশটও দেখিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বা ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের গড় দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৭ দশমিক ৭৬ ডলার।
এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এই দাম বেড়েছে ৫৫ সেন্ট। আর এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৮১ ডলার।
অর্থাৎ কয়েকটি নির্দিষ্ট স্টেশনে দাম ১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালেও পুরো ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে গড় দাম তার চেয়ে কম রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে অঙ্গরাজ্যটির জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ স্পষ্ট।
শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রেই ডিজেলের দাম নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৮৭ ডলারে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের জুনে গড়া আগের সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৮১ ডলারের রেকর্ড ভেঙে গেছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ সেন্ট। আর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৯৭ ডলার।
জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পরিবহন, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন জ্বালানি স্টেশনে অস্বাভাবিক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ফেনারে একটি জ্বালানি স্টেশনে সাধারণ পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৯ দশমিক ৬৯ ডলার ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। সিবিএস ১২ নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে গত মে মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রীয় এলাকার একটি শেভরন স্টেশনে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৮ দশমিক ৮৯ ডলার এবং সাধারণ পেট্রলের দাম ৮ দশমিক ২৯ ডলার নেওয়া হচ্ছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সান বার্নার্ডিনো ও লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকার কয়েকটি জ্বালানি স্টেশনে অস্বাভাবিক বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগে উল্লেখ করা কোনো অস্বাভাবিক দামের ঘটনা প্রমাণিত হয়নি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধকে জ্বালানির দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে, যা তেলের দামকে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, অন্তত মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই।
গত বুধবার ট্রাম্প বলেন, নির্বাচনের পরপরই তেলের দাম দ্রুত কমতে থাকবে। তার প্রত্যাশা, দাম আরও কমানো সম্ভব হবে এবং পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ২ ডলারের নিচে নামানো যেতে পারে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে পেট্রলের দাম কমে আসবে—বসন্তের শুরু থেকেই এমন কথা বলে আসছেন ট্রাম্প। ওই সময়ই তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালান।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটিতে পেট্রলের দাম কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।
এর অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে তেল বাজারে ছাড়ার অনুমোদনও দিয়েছেন।
চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মজুত থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ার অনুমোদন দেন।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে আরও প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল তেল কমে গেছে।
এর ফলে মজুতে থাকা অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ ব্যারেলে।
একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে উঠে গেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল ও পেট্রলের দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে জ্বালানি বাজারে এই চাপ আরও কতটা বাড়ে এবং সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব কতটা গভীর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।