
ইবি রিপোর্ট
দুর্গাপূজা সামনে রেখে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।
বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নির্ধারণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
রপ্তানিকারকদের আবেদন পাওয়ার পর দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও চাহিদার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত জানতে গতকাল বুধবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতেই ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানিয়েছেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর দ্রুতই ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে মতামত পাওয়ার পর শিগগির অনুমতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক মতামত আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গত বছরও দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার ভারতে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। তবে অনুমোদিত পরিমাণের তুলনায় শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ১৫০ টন।
এবার বাংলাদেশি ইলিশ রপ্তানিকারকেরা আগের বছরগুলোর মতো স্বল্প সময়ের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে রপ্তানির সুযোগ চেয়েছেন।
তাদের দাবি, অন্তত দুই মাস এবং সম্ভব হলে সারা বছর ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হোক।
রপ্তানিকারকদের যুক্তি, মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ঋণপত্র বা এলসি খোলা, ইলিশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের মতে, দীর্ঘ সময়ের জন্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হলে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে ইলিশ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারবেন এবং রপ্তানি কার্যক্রমও আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এ বছর ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চাওয়া ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে খুলনার বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ।
চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জেএস এন্টারপ্রাইজ ও আনরাজ ফিশ প্রোডাক্টস। যশোর থেকে আবেদন করেছে লাকি এন্টারপ্রাইজ, এমইউসি ফুডস, মোহতাব অ্যান্ড সন্স ও জনতা ফিশ।
ঢাকার ভিজিল্যান্ট এক্সপ্রেস, স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ, ম্যাজেস্টিক এন্টারপ্রাইজ ও বিডিএস করপোরেশনও ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে।
বরিশালের মহিমা এন্টারপ্রাইজ, এআর এন্টারপ্রাইজ ও তানিশা এন্টারপ্রাইজ; ভোলার রাফিদ এন্টারপ্রাইজ এবং সাতক্ষীরার এম এ এন্টারপ্রাইজ ও সুমন ট্রেডার্সও এবার রপ্তানির জন্য আবেদন করেছে।
শুধু বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরাই নয়, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনও।
সংগঠনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দিয়ে বাংলাদেশি ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ভারতীয় সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করত।
মাঝে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সীমিত সময়ের জন্য বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আবার ভারতে ইলিশ রপ্তানি শুরু হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার যে পরিমাণ ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে, বাস্তবে প্রায় সব বছরই তার তুলনায় কম ইলিশ রপ্তানি হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে অনুমোদন দেওয়া হয় ১ হাজার ৮৫০ টন।
২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি থাকলেও বাস্তবে রপ্তানি হয় ১ হাজার ২০০ টন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টনের অনুমতির বিপরীতে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টন।
২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভারতে যায় ১ হাজার ৩০০ টন।
আর ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে ভারতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৫৭৭ টন।
এবারও ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে দুর্গাপূজা সামনে রেখে ভারতে এবার বাংলাদেশি ইলিশ রপ্তানির সুযোগ কতটা তৈরি হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি ইলিশ আমদানির বিষয়ে ভারতের ব্যবসায়ীদের আগ্রহ এবং বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি অনুমতির দাবির কারণে বিষয়টি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব পাচ্ছে।