
ইবি রিপোর্ট
র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি দাবি করেছেন, র্যাবের সঙ্গে প্রস্তাবিত এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই। র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় না করে বিদ্যমান অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ নতুন সংস্থায় হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিরোধীদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংশোধনী গ্রহণ
স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী সদস্যরা সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরবর্তী পর্যায়ের একটি সংশোধনী মূলত ক্লারিক্যাল মিস্টেক সংশোধনের বিষয়। উপধারা দুইয়ের মধ্যে একটি বন্ধনী বন্ধ করার বিষয়টিই সেখানে সংশোধন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘বিলম্ব হলে র্যাব অস্তিত্বেই থাকবে’
বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করা হবে—এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারের অংশ ছিল। নির্বাচনী ইশতেহারেও র্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিলটি যত বিলম্বিত হবে, র্যাব ততদিন অস্তিত্বে থাকবে। তাই বিরোধী দলের সদস্যরা আসলে কী চান, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
‘বিল নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়েছে’
বিলটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও পরামর্শ হয়নি—বিরোধীদের এমন বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথম অধিবেশন থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। দ্বিতীয় অধিবেশনেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি বিবেচনার জন্য আনা হয়েছে।
তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় বিলটি বিবেচনার আগে নির্ধারিত কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় সেখানে ছিল। সংসদে বিল উত্থাপনের পরও চার-পাঁচ কার্যদিবস আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটিতেও বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বাইরের বিভিন্ন অংশীজনের মতামতও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। এসব মতামত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলটি নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শের যথেষ্ট সুযোগ ছিল।
রেকর্ড সংরক্ষণ প্রসঙ্গে যা বললেন
র্যাব থেকে এসআরবিতে স্থানান্তরের সময় নথি ও রেকর্ড কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—বিরোধীদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রেকর্ড হস্তান্তর একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়। বিধি অনুযায়ী রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ প্রতিকার কমিটি নিয়ে ব্যাখ্যা
এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে বিলের ২৪ নম্বর ধারায় প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটি যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নেরও জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি এসআরবির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কিংবা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ থাকলে তা নিষ্পত্তির জন্য এই কমিটি কাজ করবে।
তবে এটি কোনো অপরাধের তদন্তের বিষয় নয় বলে স্পষ্ট করেন তিনি। তার মতে, এটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো সদস্য অপরাধ করলে সেটি আলাদা বিষয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রতিকার কমিটির বিষয়টি প্রযোজ্য নয়।
শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা
বিলের ২১ নম্বর ধারার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইউনিটের কোনো সদস্য ১৭ নম্বর ধারায় উল্লেখিত শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলোর বাইরে অন্য কোনো শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ১৭ নম্বর ধারায় বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনের সময় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, কারও ওপর বা দায়িত্ব পালনরত কোনো সদস্যকে আঘাত করা, পেট্রোল ডিউটিতে না যাওয়া, ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা এবং আইনসঙ্গত কোনো কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো বিষয় রয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিলের ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ধারায় পৃথকভাবে ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্রেপ্তারের পর আসামিকে থানায় হস্তান্তর
গ্রেপ্তারের পর আসামিকে কোথায় নেওয়া হবে—নোট অব ডিসেন্টে উত্থাপিত এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গ্রেপ্তারের পর তাকে অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় নিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়টি ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) অনুযায়ী নির্ধারিত রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও জব্দ করা আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানার হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করার বিধানও রয়েছে।
‘র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই’
র্যাব বিলুপ্তির পর এসআরবি গঠনকে র্যাবের বিকল্প হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করা হয়েছে। আইনটি সংসদে পাস হলে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে, যার নাম হবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এই নতুন বাহিনীর কোনো সংস্পর্শ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করার কথা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও বলেছিলেন। তার দাবি, সরকার সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করেছে।
র্যাবের সম্পদ কেন এসআরবিতে যাবে
র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ অন্যান্য সম্পদ নতুন বাহিনীতে হস্তান্তরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ। র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর এসব সম্পদ নষ্ট বা নিলাম করে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, এসব সম্পদ হয় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) যাবে, নয়তো নতুন সংস্থায় হস্তান্তর করা হবে। নতুন বাহিনী গঠনের সময় একই ধরনের সরঞ্জাম আবার নতুন করে কেনার প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় না করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সেগুলোর উন্নয়ন করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তায় নতুন ইউনিট
দেশে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সাইবার স্পেসের সম্পৃক্ততা বাড়ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, বর্তমানে অনেক অপরাধেই কোনো না কোনোভাবে সাইবার স্পেস ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ কারণে সাইবার অপরাধ দমনে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে সংশোধনী আনার পাশাপাশি পুলিশের অধীনে একটি নতুন ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
র্যাব গঠনের আইনগত ভিত্তি নিয়ে বক্তব্য
র্যাবের আইনগত ভিত্তি নিয়েও সংসদে ব্যাখ্যা দেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ২০০৩ অথবা ২০০৪ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের ৬ নম্বর ধারার অধীনে র্যাব গঠন করা হয়েছিল। তার দাবি, ওই আইনটি পূর্ণাঙ্গ ছিল না এবং একটি ধারার অধীনে ইউনিটটি দীর্ঘদিন অ্যাডহক ভিত্তিতে কাজ করেছে। পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন ত্রুটি বা দুর্বলতা সামনে এসেছে।
এ কারণে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে র্যাবকে আলাদা করে বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনও নতুনভাবে সংসদে পাসের জন্য আনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এপিবিএন আইন আধুনিকায়নের উদ্যোগ
১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স ইংরেজিতে হওয়ায় এতে কিছু অস্পষ্টতা ছিল বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইনটি বাংলায় অনুবাদ করে নতুন আইনের আকারে আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পুরোনো অর্ডিন্যান্স রহিত করে নতুন আইনে রহিতকরণ ও হেফাজতকরণের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এপিবিএন আইন সংশোধন না করলে সেখানে র্যাবের আইনি অস্তিত্ব থেকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তাই র্যাব বিলুপ্তির সঙ্গে এপিবিএন আইন সংশোধন করাও জরুরি।
‘নতুন সংস্থা সমাজের চাহিদায়’
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও বলেন, র্যাব বিলুপ্তির দাবি থাকলেও নতুন কোনো সংস্থা গঠনের দাবি ছিল না—এ কথা তিনি স্বীকার করেন।
তবে তার বক্তব্য, সরকারের পরিচালনাগত প্রয়োজন, সমাজের চাহিদা এবং সময়ের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজনেই নতুন এসআরবি গঠন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, র্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনায় একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।